ঢাকার ১৭৮ স্থানে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি, জ্বলে শুধু গুলশানে

নতুন করে আরো সিগন্যাল বাতি স্থাপনের উদ্যোগ

ঢাকার প্রায় সব ট্রাফিক মোড়েই চোখে পড়ে সিগন্যাল বাতি। তবে এগুলো জ্বলে না, কোনো কাজও করে না।

ঢাকার প্রায় সব ট্রাফিক মোড়েই চোখে পড়ে সিগন্যাল বাতি। তবে এগুলো জ্বলে না, কোনো কাজও করে না। গত দুই দশকে বিশ্বব্যাংক, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) মতো ঋণদাতা সংস্থার অর্থে স্থাপিত হয়েছে এসব সিগন্যাল বাতি। রাজধানীর যানজট নিরসনে মোট ১৭৮টি স্থানে এমন বাতি থাকার কথা উঠেছে এক সমীক্ষায়। এর মধ্যে সচল সিগন্যাল বাতি আছে কেবল গুলশান ২ নম্বরে। তবে বাতি জ্বললেও সেখানে হাতের ইশারায়ই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। ঢাকায় বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত সিগন্যাল বাতিগুলোর এমন বেহাল দশার মধ্যে নতুন করে আবার একই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার পরিবহন খাতে কোনো ধরনের কাঠামোগত সংস্কার না করে অতীতে শুধু প্রকল্প হিসেবে সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে সেগুলো আর কাজ করেনি। পরিবহন খাত সুশৃঙ্খল করতে না পারলে যতই নতুন করে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হোক তা কাজে আসবে না।

বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত ঢাকার সিগন্যাল বাতিগুলো কেন কাজে লাগেনি এমন প্রশ্নে যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকায় সিগন্যাল বাতি স্থাপনের জন্য অতীতে চার-পাঁচবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উন্নত প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ আনা হয়েছিল। কিন্তু কোনোটিই কাজ করেনি। কারণ ঢাকায় সিগন্যাল বাতি কার্যকরের কোনো ব্যবস্থাই বিদ্যমান নেই। বর্তমান ব্যবস্থায় যত ভালো প্রযুক্তির সিগন্যাল বাতিই আনা হোক না কেন তা কাজ করবে না।’

ঢাকা মহানগরের জন্য প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) দ্বিতীয়বারের হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সর্বশেষ হালনাগাদ এসটিপি ২০২৫-এর একটি খসড়া প্রকাশ করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ঢাকায় প্রথমবারের মতো সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয় ষাটের দশকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেগুলো অকেজো হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণে ঢাকার ৬৮টি স্থানে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। সে সময় এসব বাতির পেছনে বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। চালুর পর এসব বাতি খুব একটা কাজ করেনি এবং ২০০৯ সালের মধ্যে সবই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকায় সব মিলিয়ে ৯১টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল বাতি গড়ে তোলা হয়। এ বাতিগুলোও কোনো কাজে আসেনি। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জাইকার ঋণে ঢাকার চারটি ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। সেগুলোও অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

এসটিপির খসড়া সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের ১৭৮টি স্থানে সিগন্যাল বাতির উপস্থিতি আছে। তবে বাতি কার্যকর (জ্বলে-নিভে) আছে কেবল গুলশান ২ নম্বরে।

অতীতে কাজ না করার একাধিক উদাহরণ সামনে রেখেই ঢাকায় নতুন করে সিগন্যাল বাতি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি মোড়ে নতুন করে এসব ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

উদ্যোগটি সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকায় একটি মডেল সড়ক নির্মাণের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য নির্বাচন করা হয়েছে হাইকোর্ট থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত রুটটিকে। এরই মধ্যে ওই সড়কের বিভিন্ন স্থানে সিগন্যাল বাতি বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। আর এ বাতিগুলো আমাদের পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র।’

সিগন্যাল বাতি ছাড়াও পুরো করিডোরটিতে প্রয়োজনীয় সাইন সিগন্যাল দেয়া হবে জানিয়ে শেখ মইনউদ্দিন বলেন, ‘জেব্রা ক্রসিং থাকবে, কাউন্টাডাউন টাইমার থাকবে। বাসে যাত্রী ওঠা-নামানোর জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। পুরো করিডোরের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীদের নিযুক্ত করা হবে। এ মডেল সড়ক কাজ করলে ঢাকার অন্যান্য সড়কেও একই উদ্যোগ নেয়া হবে।’

তবে নতুন করে সিগন্যাল বাতি স্থাপনের আগে অতীতেরগুলো কেন কাজ করেনি, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দিকে সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বারোপের পরামর্শ দিয়েছেন ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘সিগন্যাল বাতি তখনই কাজ করবে, যখন ঢাকার পরিবহন খাত সুশৃঙ্খল হবে। সব যানবাহন নিয়ম মেনে চলবে। পথচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ফুটপাত থাকবে। পার্কিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবার মতো বিষয়গুলো থাকবে।’

আরও