বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ঘূর্ণিপাকে ছিল খালেদা জিয়ার ২০০১-০৬ শাসনামল

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার লক্ষ্য করে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমানের আঘাত বিশ্বরাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার লক্ষ্য করে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমানের আঘাত বিশ্বরাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। এর আগের পুরো দশকেই আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান, তাদের শাসনের ছায়ায় আল-কায়েদার অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা নিয়ে বিভিন্ন স্তরে সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলার পর সে সতর্কবার্তা রূপ নেয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া নিরাপত্তা সংকটে। ওয়াশিংটন সঙ্গে সঙ্গে ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করে। যাতে যোগ দেয় তার পশ্চিমা মিত্ররা। আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয় ২০০১ সালের অক্টোবরে। এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির যুগ। যার ঢেউ এসে লাগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাজনীতি ও কূটনীতিতেও।

৯/১১ হামলার প্রেক্ষাপটে পাল্টে যায় পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নীতির চরিত্রও। অভিবাসন থেকে ব্যাংকিং লেনদেন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় থেকে উন্নয়ন সহায়তা—সবকিছুই নতুন করে সাজানো হয় সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর অধীনে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জোট, ধর্মভিত্তিক দল, মাদ্রাসা শিক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—প্রতিটি বিষয়ে কড়া নজরদারি শুরু হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় কে কার সঙ্গে জোট করছে, কোন দলের আদর্শ কী, রাষ্ট্রের নীতি কতটা সেক্যুলার—এসব বিষয় পশ্চিমা নীতিনির্ধারণী মহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেতে থাকে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক—সব জায়গায় আলোচনার ফ্রেম প্রায় একই—দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মানচিত্রে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। যেসব দেশে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি বা যেখানে ইসলামী দলগুলো রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, সেসব রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক জোট ও ধর্মভিত্তিক দলীয় উপস্থিতিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে মূল্যায়িত করতে থাকে পশ্চিমা বিশ্ব।

এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই ২০০১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সেখান থেকেই খালেদা জিয়ার শাসনামল (২০০১-০৬) প্রবেশ করে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অস্থির ও জটিল ঘূর্ণিপাকে। ওই জোটে ছিল দুটি ইসলামী দল—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোট। ৯/১১-পরবর্তী বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইসলামী দলকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসার বিষয়টি পশ্চিমাদের নজরে আসে। ফলে ক্ষমতায় আসার প্রথম থেকেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে পড়তে হয় এক ধরনের কূটনৈতিক অস্বস্তি ঘেরা পরিবেশে। ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় মূলধারার নীতি আলোচনায় তখন প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশ কি প্রচলিত মধ্যপন্থী, সংবিধান-নির্ভর অবস্থানে আছে, নাকি ইসলামী জোটসঙ্গীদের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় নীতিতে নতুন ধরনের আদর্শিক প্রভাব তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কিছু গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। তবে সরকারিভাবে খালেদা জিয়া সরকারের অবস্থান ছিল পরিষ্কার—বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় দেয় না, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে উগ্রবাদ প্রচারের সুযোগ নেই। কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক নীতি তখন এতটাই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল যে ৯/১১-পরবর্তী মুসলিম দেশগুলোয় ইসলামী ধারার দলগুলোর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নীতিনির্ধারকদের নজরে বেশি আসতে থাকে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ক্ষমতাসীন জোটে ইসলামপন্থী দল আছে—শুধু এ কারণেই সন্দেহের স্থায়ী সূত্র তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসে প্রকাশিত নথি সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী (হুজি), জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশসহ (জেএমজেবি) বেশ কয়েকটি সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয় কূটনীতিক মহলে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে দুটি ইসলামী দলের অংশগ্রহণের ফলে রাজনীতির ভেতরে ইসলামী সংগঠনগুলোর জন্য ‘স্পেস’ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করে আসছিলেন তারা। এ সময় দেশের মধ্যে বাংলা ভাই ও জেএমবি–সংক্রান্ত ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। এর মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে সারা দেশে বোমা হামলার ঘটনা বাংলাদেশকে জোর আলোচনায় নিয়ে আসে। এছাড়া ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা নিহত ও আহত হন, যা দেশী–বিদেশী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একই বছর সিলেট শাহজালাল মাজার প্রাঙ্গণে বোমা হামলায় ব্রিটিশ হাইকমিশনারসহ কয়েকজন আহত হন। এ দুই ঘটনার পর পশ্চিমাদের উদ্বেগ আরো জোরালো হয়।

এছাড়া ২০০৬ সালের ১১ জুলাই ভারতের মুম্বাইয়ের ট্রেনে সিরিজ বোমা হামলায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত ও কয়েকশ যাত্রী আহত হন। ভারত দাবি করে, হামলার ঘটনায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশভিত্তিক নেটওয়ার্ক যুক্ত। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) তৎকালীন সভাপতি রাজনাথ সিং দাবি করেন, বাংলাদেশে কথিত জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব অভিযোগকে ভিত্তি করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় বাংলাদেশবিরোধী ন্যারেটিভ গড়ে তোলার চেষ্টা করে নয়াদিল্লি।

সব মিলিয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে খালেদা জিয়ার জন্য শুরু হয় এক দীর্ঘ প্রতিকূল আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সময়কাল। একদিকে তাকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোট সমীকরণ ধরে রাখতে হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিশ্চয়তা দিতে হয়েছে—বাংলাদেশ কোনো উগ্র আদর্শিক পথে যাচ্ছে না। পশ্চিমাদের নীতি তখন এতটাই কঠোর ছিল, ব্যাখ্যা দেয়া বা অবস্থান বুঝিয়ে বলাটাই হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের কূটনৈতিক টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে পথচলা। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও আঞ্চলিক কূটনীতির আলোচ্যসূচিতে বাংলাদেশকে রিজিওনাল সিকিউরিটি ডিসকোর্সের অংশ হিসেবে আলোচনায় তোলা হতে থাকে।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, উন্নয়ন সহায়তা অব্যাহত রাখা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা—সব ক্ষেত্রেই খালেদা জিয়াকে নিতে হয়েছে আত্মরক্ষামূলক কূটনৈতিক অবস্থান। বক্তব্য, ব্রিফিং ও রাষ্ট্রীয় যোগাযোগে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক চরিত্র ও রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বারবার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে—বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক নীতির অংশীদার, ইসলামী দল সরকারে আছে মানেই রাষ্ট্র কোনো উগ্র আদর্শিক পথে যাচ্ছে না, বরং সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোই এখানে কার্যকর। একদিকে জোট রাজনীতির বাস্তবতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কূটনৈতিক আলোচনার চাপ—এই দুই সমান্তরাল বাস্তবতার মধ্যেই পরিচালিত হয়েছে খালেদা জিয়ার শাসনকাল। পশ্চিমাদের সন্দেহ, পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যার চাপের ভেতর দিয়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর সে চাপের কেন্দ্রেই ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, টুইন টাওয়ার হামলার পর বদলে যাওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণিপাক ও কূটনৈতিক চাপে ঘেরা এক অস্থির সময় হিসেবে কেটেছে খালেদা জিয়ার ২০০১-০৬ শাসনামল।

আরও