গ্যাস-তেল উত্তোলন করতেই হবে, সমুদ্রে অনুসন্ধানে বিদেশী কোম্পানি প্রয়োজন

চার দশকের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের শিল্পায়নের উত্থান-পতনের সাক্ষী মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। ১৯৮৪ সালে মুন্নুতে যোগ দিয়ে দেখেছেন লন্ডনে প্রথম রফতানি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের স্বীকৃতি এবং ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে মুন্নুর পণ্যের স্থান পাওয়া। আবার গ্যাস ও বিনিয়োগ সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তাও দেখেছেন কাছ থেকে। সিরামিক শিল্পের বর্তমান সংকট, রফতানি সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম

শুরুতেই আপনার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে একটু জানতে চাই। আপনার ছাত্রজীবন থেকে একটু শুরু করি। আপনি বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছিলেন।

ছাত্রজীবনের শুরুতে আমার এমন মেধা ছিল না যে বিজ্ঞান পড়ব বা বিজ্ঞান পড়তে পারব। তাই নবম শ্রেণী থেকে বাণিজ্য বিভাগে পড়ি। এটা পরিবারের জন্য একটা বিরাট বিষয় ছিল। আমার ভাইরা বিজ্ঞানে পড়ছে, অন্য বোনেরাও বিজ্ঞানে পড়ছে, আর আমি বাণিজ্যে পড়ছি। তখন আম্মা বেশ চাপ দিতেন যে তুমি বাণিজ্যে পড়ছ, অন্যরা বিজ্ঞানে পড়ছে। আমি বলেছি আমি এ বিষয়টি বুঝি, তাই বাণিজ্যেই পড়ছিলাম। আম্মার চাপে মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগ পেলাম। তাতেও তিনি খুশি হলেন না।

সেটি মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল। আপনার জন্ম মোহাম্মদপুরে?

আমার জন্ম সিলেটে। আমি মূলত সিলেটের। এরপর ঢাকা কলেজে যখন পড়ছি, তখন মনে হলো একটু ভালো করে পড়ে দেখি। একটা জেদ চেপে গেল। এরপর দেখলাম, ইন্টারমিডিয়েটে আমি স্ট্যান্ড করেছি। তখন আম্মার দুঃখ ঘুচল।

আমি ব্যক্তিগতভাবে যে বিষয়টি বুঝি, সেটিই সারাজীবন আমার সঙ্গে আছে। মূলত অ্যাকাউন্টিং।

এরপর আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন?

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকম অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি। তারপর ব্যবসাজীবনে জড়িয়ে গেলাম।

আপনি ১৯৮৪ সালে মুন্নু সিরামিকে যোগ দিলেন। তার আগে অন্য কোথাও চাকরি করেছিলেন কি?

না। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, তখন আমার সঙ্গেই আবার স্ট্যান্ড করেছিলেন আমার স্ত্রী। উনি অষ্টম হয়েছিলেন। সেখান থেকেই পরিচয়, প্রণয়, তারপর বিয়ে। তখন মুন্নু মাত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। হারুন অর রশিদ মুন্নু সাহেবের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, তুমি কী করতে চাও? আমি বললাম, পাস করতে আরো এক বছর আছে। আপনি কী বলেন?

এর আগে আমি রতন টাটার একটি কাহিনী পড়েছিলাম। তিনি দেখতে গিয়েছিলেন ভারতে টাটারা কী করেছে। সেই সূত্রে তিনি টাটায় যোগ দিয়েছিলেন। তার তুলনায় আমি কিছুই না। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই মুন্নুতে যোগ দিলাম। তখন থেকেই মুন্নুতে আছি। এখন অবসরে গিয়েছি, ছেলেরা ব্যবসা দেখছে।

অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়ালেখা এবং দীর্ঘ সময় মুন্নুতে কাজ করা, এখন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেয়া, এ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলবেন...

দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রথম দিকটা খুবই সমৃদ্ধ ছিল। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত জায়গায় আমাদের পণ্য নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। সেগুলো এখনো আছে। আমাদের পণ্য এখনো প্রদর্শনীতে আছে।

তখন অভিজ্ঞতা অনেক ভালো ছিল। আমরা যেখানেই যাচ্ছি, মান ও সেবার জন্য ভালো সাড়া পাচ্ছি। ওই সময় রফতানি নিয়ে আমাকে কখনো চিন্তা করতে হতো না যে কার কাছে বিক্রি করব। বরং চাহিদার তুলনায় আমাদের কারখানার সক্ষমতা সবসময় কম ছিল।

১৯৮৪ সালের দিকে, কেউ কারখানা করলে সরকার ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ দিত। তখন গ্যাসেরও অভাব ছিল না। গ্যাসের দাম ছিল প্রতি ঘনফুট ৬ টাকা। বিদেশী অর্থায়নের ব্যবস্থাও ছিল, সৌদি গ্রান্ট ছিল। আমরা কারখানা বড় করতে থাকলাম। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে গ্যাসের সমস্যা শুরু হলো।

সিরামিক শিল্পের পথিকৃৎ হারুন অর রশিদ খানের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার কর্মভাবনা বা ব্যবসায়িক কোনো নীতি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে কি?

তিনি আমার মেন্টর ছিলেন। তার মতো লোক বাংলাদেশে অনেক দরকার। তার মতো মানুষরাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছেন। তাদের যে স্বপ্ন ছিল—সৎভাবে কাজ করা এবং ব্যবসা নিয়ে যেভাবে সিরিয়াস ছিলেন, সেটা অকল্পনীয়।

তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গেলেন, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেন। মানিকগঞ্জ জেলা ঢাকা শহরের এত কাছে, অথচ এত অবহেলিত ছিল! এরপর তিনি সেখানে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স বসালেন, মুন্নু মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, স্কুল করেছেন।

ইংল্যান্ডে আপনাদের পণ্য পৌঁছে দেয়ার গল্পটা শুনতে চাই।

মুন্নু সাহেবের মধ্যে গড-গিফটেড একটা বিষয় ছিল। তিনি বলতেন, রফতানিতে যাব। এত ভালো মানের পণ্য, এটা রফতানি করতেই হবে।

১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে উৎপাদন শুরু হলো। আমি তখন অ্যাকাউন্টসের দায়িত্বে। মান নিয়ন্ত্রণ নয়, মূলত খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য কারখানায় যেতাম।

আগস্টে তিনি বললেন, চলো আমরা লন্ডন যাই। তিনি বিক্রি ও বিপণন করবেন, আমি সঙ্গে থাকব। এক সুন্দর সকালে আমরা লন্ডনে গেলাম।

সেখানে কী কী হলো?

গিয়ে অর্ডারও পেয়ে গেলেন। আমার মনে আছে, ওই লোকটির নাম কেভিন, মিস্টার অ্যান্ড্রু কেভিন। তিনি যখন নমুনাগুলো দেখছিলেন, বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে এগুলো বাংলাদেশে তৈরি। কেভিন প্রথম অর্ডারও দিয়ে দিলেন। কোম্পানিটি ব্রিস্টলে ছিল।

আমরা নিয়মিত হাতে হাতে নমুনা নিয়ে যেতাম। তখন তিনি সবসময় বলতেন, উৎপাদন সহজ, কিন্তু বিক্রি করা সবচেয়ে কঠিন।

১৯৮৬ সালে তিনি ওই কেভিনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিস্টার কেভিন, হাউ মাচ মানি নিড টু সেট আপ ব্রাঞ্চ অফিস?’

কেভিন বললেন, ‘মিস্টার খান, ইউ ক্যান্ট ডু ইট, ইটস নট পসিবল...’

তিনি খুব রেগে গেলেন। বের হয়ে আমাকে বললেন, ‘ও কী মনে করেছে, এখানে একটা ব্রাঞ্চ অফিস খুলব? এটা পারব না। এত বড় কারখানা করেছি!’ তিনি সত্যিই লন্ডনে অফিস করে ফেললেন। তারপর আমাকে ১৯৮৬ সালে লন্ডনে চলে যেতে হলো, পরিবারসহ। তখন আমার একটাই ছেলে।

ইংল্যান্ডের মিউজিয়ামেও তো আপনাদের পণ্য আছে?

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে আমাদের পণ্য আছে। এরপর ইউরোপ, আমেরিকা, সৌদি আরবেও গেছে।

লন্ডনের অফিস কি এখনো আছে?

না, এখন আর নেই। ২০০৮ সাল থেকে যখন গ্যাসের সমস্যা শুরু হলো, এরপর সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

গ্যাস তো সিরামিক শিল্পের অন্যতম জ্বালানি। আপনাদের কিল্ন বা চুল্লি সচল রাখতে ১০-১৫ পিএসআই চাপ লাগে। এখন যতদূর জানি, সেটা এক থেকে দুই পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি কীভাবে সামলাচ্ছেন?

গ্যাসের সমস্যা ২০১০-১১ সালে প্রকট হয়ে উঠল। মোটামুটি আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। ঢাকা-আরিচা রোডে গ্যাসের সমস্যা প্রথম প্রকট হলো।

তখন আমরা যখনই জার্মানিতে মেশিন সরবরাহকারীদের কাছে যাচ্ছি, বলছি, তোমরা কি গ্যাস ছাড়া বিকল্প কিছু বের করনি? তারা বলল, না, এটা গ্যাস ছাড়া হবে না।

একবার আমি চীনে গিয়েছিলাম। জাপানি একটি কোম্পানি চীনের গুয়াংজুতে মেশিন বানায়। তারা আমাকে একটি কারখানায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে দেখলাম হাইড্রোজেন দিয়ে একটি কিল্ন বানিয়েছে এবং সেটা দিয়ে উৎপাদন করছে।

এখন আপনি অনলাইনে গেলে দেখবেন, হাইড্রোজেনের জেনারেটর বিক্রি হচ্ছে। হাইড্রোজেনের গাড়িও হয়েছে।

এরপর আমরা দেখলাম আরো অনেক দেশে যখন গ্যাসের সমস্যা হচ্ছিল, তারা ইলেকট্রিক কিল্ন বানিয়েছে। এটা কিছুটা ব্যয়বহুল, কিন্তু বানিয়েছে। এরপর এলপিজি চলে এসেছে।

যেহেতু আমাদের কারখানা পুরনো, আরো অনেকের কারখানাও পুরনো, তাই প্রযুক্তি পরিবর্তন করতে গেলে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু এরই মধ্যে অনেক কারখানা পরিবর্তন করেছে। কেউ এলপিজি নিয়েছে, কেউ সোলারে গেছে।

এখানেও মজার কাহিনী আছে। আমরা যখন প্রথম কারখানা করি, তখন আরইবির (রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন বোর্ড) সংযোগ ছিল। আমরা আরইবি অ্যাওয়ার্ডও পেতাম। তখন ধামরাইতে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিল আমরাই পরিশোধ করতাম।

এরপর শুরু হলো বিদ্যুৎ আসে, বিদ্যুৎ যায়। এতে ফর্মিং মেশিনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তখন সরকার ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের অনুমতি দিল। আমরা ক্যাপটিভে গেলাম, আরইবি ছেড়ে দিলাম।

দেখেন, ২০ বছর পর আরইবি এখন অনেক শক্তিশালী। আমরা আবার আরইবিতে গিয়েছি। ক্যাপটিভ ছেড়ে এখন আরইবিতে গিয়েছি, সোলারেও গিয়েছি।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের যে তীব্র সংকট, তাতে অনেক শিল্প বসে গেছে, উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে শুনছি। আপনাদের শিল্পের কী অবস্থা?

অনেক টেবিল ও টাইলস কারখানা প্রায় বন্ধের মতো। এখন তো একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, কয়টি কারখানা বন্ধ হয়েছে? আপনি বন্ধ বলতে পারবেন না। আর যদি তালিকাভুক্ত কোম্পানি হন, আরো বলতে পারবেন না। এ কারণে এখন কয়টি কারখানা বন্ধ, কয়টি খোলা, এগুলো সহজে কেউ স্বীকার করবে না।

তবে যেগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, যাদের আর কোনো উপায় নেই, যেমন সিরামিকে বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

মানে পুরোপুরি বন্ধ?

হ্যাঁ, কারণ গ্যাস নেই। যেহেতু গ্যাস নেই, আর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন যেভাবে গ্যাস কমে গেছে, আরো অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে আছে।

সরকার বলছে আর দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস চলে আসবে। কিন্তু কিল্ন একবার বন্ধ করলে আপনার এক থেকে দেড় মাস লাগে। পুরনো কিল্ন হলে তাপমাত্রা তুলতে তিন মাস লাগে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তিতাস গ্যাসের কাছে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আপনারা যদি সিএনজির একটি ব্যবস্থা করেন, যেখানে চাপ দিয়ে গ্যাস পাম্প করে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে সিরামিক কারখানাকে কেন দেবেন না? তারা দেয়নি।

আমি বলছিলাম, হঠাৎ করে শাটডাউন হলে কিল্নের অনেক ক্ষতি হয়। গ্যাস বন্ধ হয়ে গেছে, তখন সিএনজির ভরা সিলিন্ডার থাকলে সেটি ব্যবহার করা যাবে। তারা বলত, এখানে ঝুঁকি আছে।

আমি বলেছি, কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখেন, বাজারের মধ্যে একটা সিএনজি স্টেশন আছে। আমি তাদের এমডিকে বলেছি, আপনি কারওয়ান বাজারে কীভাবে অনুমতি দিলেন? সেটা কি বিস্ফোরিত হবে না? আজ পর্যন্ত দেখবেন না কোনো সিএনজি স্টেশন বিস্ফোরিত হয়েছে।

সরকারে কি আমলারা তাহলে বসে আছেন শুধু না বলার জন্য?

এরপর বললাম, আমাকে একটা কাজ করতে দেন। আমরা মাটির নিচে বড় একটা ধাতব ট্যাংক বসাই। জাহাজে তো অনেক শক্ত ট্যাংক পাওয়া যায়। আমার মাথায় এল, ট্যাংক থাকলে কিছু একটা সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। কিন্তু সেটাও তারা অনুমতি দিল না। এভাবে না করতে করতে এখন কী হয়েছে? পুরো বাংলাদেশে এখন গ্যাস না থাকার মতো হয়ে গেছে।

আমাদের এখন শিল্পে কর কাঠামোর কী অবস্থা? আগের মতো আমদানিতে কাস্টমস ও করের বোঝা আছে কি? আবার এর বিপরীতে যেগুলো তৈরি পণ্য, সেগুলো কি সুবিধা পাচ্ছে? কোনো বৈষম্য আছে কি?

১৯৭০-এর শেষ ও ১৯৮০-এর দশকে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেই মূলত শিল্পায়ন শুরু হলো। তখন এনবিআর যে পরিমাণ সহযোগিতা করেছে, সেটা অস্বীকার করার মতো নয়। পোর্টেও কোনো অসুবিধা ছিল না। ইপিবি অসাধারণ সাহায্য করত।

আমেরিকায় জিএসপি করা হয়েছিল মুন্নু সিরামিকের। প্রথমেই মুন্নু সিরামিকের নামে জিএসপি ছিল। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে যে পরিমাণ সহযোগিতা পেয়েছি, সেটা অকল্পনীয়।

কিন্তু এখন এনবিআর ইনভয়েসে কাদা-মাটি, যেটা আপনি কোথাও বিক্রি করতে পারবেন না, সেই কাদা-মাটি দিয়ে আপনাকে বানাতে হবে সিরামিক। এটা দিয়ে ইটও বানাতে পারবেন। কিন্তু এটাকেই সিরামিক বানাতে হবে, ওই তাপমাত্রায় ফায়ার করতে হবে।

কারণ বিদেশে যখন এটা তৈরি হয়েছে, তারা এমনভাবে প্রযুক্তি তৈরি করেছে যে ওই মেশিন লাগবে, ওই কিল্ন লাগবে, তাহলেই কেবল নির্দিষ্ট কাঠামো দেয়া যাবে। এখন আমরা যে ইনভয়েস মূল্য আনি, তারা সেটা মানে না। বলে, এখানে কম মূল্য দেখানো হয়েছে, বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। এসব নিয়ে আমাদের ঝামেলা হয়।

আরেকটা ঝামেলা আছে ভ্যাটের ক্ষেত্রে। আজকে গ্যাস আপনার সক্ষমতা অনুযায়ী নেই, কারো সক্ষমতা ঠিক নেই। কিন্তু ভ্যাটের ক্ষেত্রে তারা মাসে মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে দেয়। তাদের টার্গেট আছে, সেই টার্গেট অনুযায়ী ভ্যাট দিতেই হবে। করের ক্ষেত্রেও তাদের টার্গেট আছে। সেই টার্গেট আপনাকে দিতেই হবে। অন্যান্য খরচও আমরা সবাই জানি। সেই খরচটাও দিতে হবে।

এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান এসেছেন। তার সঙ্গে মিটিং হয়েছে। আমি দেখলাম, তার মধ্যে পরিবর্তন করার একটা ইচ্ছা আছে। আশা করি তিনি পারবেন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনবিআর ভাগ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যা হলো, আমরা দেখেছি। আমরা ব্যবসায়ীরা ওই (তৎকালীন) চেয়ারম্যানকে সমর্থন দিয়েছিলাম। তার সঙ্গে কথা ছিল, আমরা যখন সাহায্য করব, তিনি তাদের চাকরি থেকে সরাবেন না। কিন্তু তিনি কী করলেন? ওই বিদ্রোহীদের চাকরিচ্যুত করলেন। তখন আমরা ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়ে গেলাম।

আপনাদের শিল্পে জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। প্রযুক্তিগতভাবে কি এমন কোনো ব্যবস্থা হয়েছে, যাতে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্প চালানো যায়?

আপনি তো কিছু গ্যাস পাবেনই। শ্রীলংকার যেমন নিজস্ব কোনো গ্যাস নেই। ইউরোপও আজকের যুদ্ধে বুঝেছে, তারা রাশিয়ার ওপর কতটা নির্ভরশীল ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে যখন তাদের অবস্থা খারাপ হলো, তখন তারা কাতার থেকে এলএনজি নেয়া শুরু করল। তখনই কিন্তু আমরা সমস্যায় পড়লাম।

২০১৯ সাল পর্যন্ত আমাদের সমস্যা এত বেশি ছিল না। ভবিষ্যতে এত গ্যাস দিয়ে পুরোটা করতে হবে না।

আপনাদের সিরামিক ছাড়াও ফ্যাব্রিক আছে...

ফ্যাব্রিক আছে, গার্মেন্টস আছে। ওগুলোর অবস্থাও গ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। মানিকগঞ্জে একদম শেষ প্রান্তে আমাদের গার্মেন্টস বন্ধ করে দিয়েছি। যেহেতু সেটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ছিল, ওটা নিয়ে আমাদের আর মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ফ্যাব্রিক্স এখনো চলছে। আরইবির বিদ্যুতে সুতা হয়। এখনো কিছু ডায়িং হয়। ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু হবে।

বর্তমানে যে গ্যাসের সংকট হচ্ছে, আমি এরই মধ্যে শুনেছি ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আর গ্যাসনির্ভর থাকবে না। তারা সোলারের দিকে যাবে, বয়লার চালাবে। বয়লার চললে তাদের আর ইলেকট্রিসিটি ও গ্যাসের প্রয়োজন হবে না। টেক্সটাইলে ডায়িং, ফিনিশিংয়ে গ্যাস লাগবে। সেখানে এলপিজি দিয়ে আসবে।

বর্তমানে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমি সবসময় আশা করি সরকার এ উদ্যোগ রাখবে। যেভাবেই হোক, আমাদের নিজস্ব গ্যাস ও তেল উত্তোলন শুরু করতেই হবে। এটা করতেই হবে।

গ্যাস অনুসন্ধানে বিপি, টোটাল, এক্সনকে আনেন। ওই টেন্ডার দিয়ে তো তারা আসবে না। তাদের নিয়ে এলেই অনুসন্ধান শুরু হবে।

আমি আরেকটি টকশোতেও বলেছি, বাপেক্সের ওপর আমার এখন আর আগের মতো বিশ্বাস নেই।

বিদেশী ব্যবস্থাপনার অনেক ইতিবাচক দিক আছে। সরকারকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসতে হবে। রিলায়েন্স প্রথমে লাইসেন্স নিয়েছিল, সেখানে অনুসন্ধান করবে। আমি নিজেও ভারতে দেখেছি, অনেক সাইনবোর্ড লাগিয়েছে, গভীর সমুদ্রে কাজ করবে। কিন্তু এখন গিয়ে দেখবেন, বিপি করছে। বিপি ভারতে আছে, মিয়ানমারে আছে, থাইল্যান্ডে আছে।

বিদেশী কাউকে দিয়ে দেন। রাশিয়াকে দিতে পারবেন না, চীনের প্রযুক্তি এত নির্ভরযোগ্য নয়। আমেরিকার কাউকে হলে দেন। এ নিয়ে আলোচনা করে দেন। কারণ আমাদের প্রয়োজন অনেক বেশি, তীব্রভাবে গ্যাস প্রয়োজন।

আমাদের সমুদ্রসম্পদের ক্ষেত্রগুলো তো এখনো বিকশিত হওয়া শুরু হয়নি।

তেল উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেল। তখন শুনলাম, তেল উঠলে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে কি ক্ষুধার্ত থাকবেন?

বড়পুকুরিয়ার কয়লা উত্তোলন করা খুবই জরুরি। এ সরকার শুনেছি উদ্যোগ নিয়েছেন। করবেন। ওপেন পিট করতেই হবে। কোরিয়ায় খুব ভালো উদাহরণ আছে। তারা এক পাশ দিয়ে কয়লা উত্তোলন করে, আবার মাটি দিয়ে ভরে দেয়। সেখানে আবার ভবন তৈরি করে। যারা ভূমিহীন হয়ে গেল, তাদের আবার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এভাবেই কর্মসূচি করতে হবে।

গ্যাসের সমস্যার কথা বললেন। সুদের হার ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার দিকে তাকালে বিনিয়োগ ও কারখানার সম্প্রসারণ কীভাবে হবে?

বিগত বছরগুলোতে কি কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়েছে? আমি কোনো টেকসই উন্নয়ন দেখিনি। একটা কথা আছে, আপনি টেকসইভাবে কিছু না করলে একটা সময় আপনাকে এর মূল্য দিতেই হবে। এখন আমরা সেই মূল্য দিচ্ছি। মূল্য দেয়ার পর মানুষ ভুল থেকে শেখে।

আমরা জনগণ খুব বিপদের মধ্যে পড়ে গিয়েছি। এখন যেহেতু বৈদেশিক রেমিট্যান্স আছে, ঘরে ঘরে ওই ধরনের অভাব নেই।

গ্যাস ও তেলে আমি সরকারি কোনো দক্ষ জনশক্তি দেখিনি। আমি সে সময় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিজে গিয়েছি, বলেছি আপনারা এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) বাতিল করবেন না। এটা করা উচিত হবে না। কিন্তু তারা সেটা বাতিল করেছে। আমার সামনে সচিবও একমত ছিলেন যে এটি বাতিল করা হবে। তিনি বাতিল করলেন, তার পদোন্নতি হয়েছে। আমলাদের কোনো অসুবিধা হয় না।

ব্যাংকের সুদের হারের যে প্রশ্ন করছেন, আমরা হিসাব করে দেখছি, ১১ শতাংশ। আপনারা সবাই দেখেছেন, বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থা। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভবন দেখেন, তাদের সম্পদের বাহাদুরি দেখেন। সরকার জোর করে গাড়ি কেনা বন্ধ করল, ঠিক আছে। তারা মুনাফা করছে। কিন্তু সেটার একটা সীমা থাকা উচিত।

আমরা দেখছি, ১১ শতাংশ হলেও ব্যাংকের মুনাফা হবে। কিন্তু ব্যাংক যদি মুনাফাখোর হয়ে যায় এবং লভ্যাংশ ঘোষণা করে, তাহলে আমাদের দেশে তো ওই ধরনের ব্যাংক থাকার দরকার নেই।

বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা দেখেন, সরকারি ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা দেখেন। এগুলো সরকারকে সংশোধন করতেই হবে।

বাংলাদেশে এখন ৭০টির বেশি সিরামিক শিল্প-কারখানা আছে। আপনাদের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার চিত্রটা কী?

বিশেষ করে টাইলস ও স্যানিটারিতে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এখন খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। কারণ বিল্ডিং বা গৃহনির্মাণ শিল্পে একটা বিরাট ধস নেমেছে। একটা ভুল কর নীতি হয়েছে। আশা করি সরকার সেখান থেকে সরে আসবে।

আবাসন শিল্পে যে পরিমাণ ধস নেমেছে, সরকারকে খুব ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে। আগের যিনি রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি সরকারকে বলেছিলেন, টাকাটা এখন বাইরে যাচ্ছে এবং বেগমপাড়া হচ্ছে। অপ্রদর্শিত আয়টাকে এ শিল্পের জন্য নিয়ে আসা যায় কিনা।

আবাসন শিল্পে যে ধস নেমেছে, তাতে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালের প্রত্যেকটি খাত, সিমেন্ট, রড ও সিরামিক খাতে একটা বিরাট প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অনেকেই আবার কারখানার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

আপনাদের দুই ধরনের প্রতিযোগিতা। একটি নিজেদের মধ্যে, একটি কোম্পানি আরেকটি কোম্পানির সঙ্গে। আবার আমদানির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা।

আমি যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে টেবিলওয়্যারের লোক, আমি এখনো টাইলস ও স্যানিটারির লোকজনকে বলছি, আপনারা রফতানিতে আসেন। কিন্তু তারা এখনো ওই রকম উৎসাহ পাচ্ছে না যে রফতানিতে যেতে হবে।

এরই মধ্যে কিছু কারখানা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করার জন্য খুব ইউনিক পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে, যেটা আরেকজন পারবে না। তারাও চিন্তা করছে, আমাকে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য বানাতে হবে। আরেকটা হচ্ছে একজন যেটা বানাবে সেটা অন্যজনে বানাবে না। নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়ায় আসতে হবে। সবাই সবকিছু করলে সুবিধা চলে যাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। কারণ আপনি কিন্তু সরাসরি কাস্টমারের কাছে বিক্রি করতে পারছেন না। বাংলাদেশে ডিসট্রিবিউশনের যে চ্যানেল তাতে সরাসরি কাস্টমারের কাছে বিক্রি করলে ঝামেলা আছে। এই প্রতিযোগিতা একদিকে ভালো। আমি এটা ভালো বলি, কারণ এরপর তারা রফতানিতে উৎসাহিত হবে।

রফতানির কথা বলছিলেন। আমাদের এই শিল্প অনেক পুরনো। স্থানীয় বাজারে একটা পর্যায়ে এসেছে। তার পরও আপনি বলছেন, রফতানিতে তেমন ব্যাপ্তি নেই। এটা কেন? আপনি তো সংগঠনের সভাপতি। আপনি কী বলবেন?

প্রথমেই বলে নিয়েছি, হারুন অর রশীদ মুন্নু সাহেবের একটা ইচ্ছা ছিল যে, তিনি পণ্যটি রফতানি করবেন। তিনি করেছেনও।

কিন্তু এখন অনেক মালিকের সঙ্গে আমার কথা হয়, অথবা সেখানে যারা বিক্রয় বিভাগের প্রধান, তাদের সঙ্গে কথা হয়। তখন আমি দেখতে পাই যে তাদের সেই ইচ্ছাটা নেই। রফতানি খুব সহজ নয়। কিন্তু প্রথমত তাদের সেই ইচ্ছাটা নেই। আমি তাদের নিয়মিত বলছি, ঠিক আছে, আপনি মালিক, আপনি এখন সিনিয়র হয়ে গেছেন। আপনি কষ্ট করতে চাচ্ছেন না, বিদেশে একটা প্রদর্শনীতে গিয়ে সময় দেয়ার মতো সময় নেই।

টাইলস শিল্পের মালিকরা সবাই অলিগার্ক, বড় বড় টাইলস কোম্পানির মালিক। তাদের বলি যে ঠিক আছে, আপনারা যাবেন না, কিন্তু আপনাদের যে তরুণ ও গতিশীল মার্কেটিং কর্মীরা আছে, তাদের আমাকে নিয়ে যেতে দেন। আপনাদের তো খুব বেশি খরচ হবে না।

তারা ইতালিতে যাবে। জার্মানিতে যাবে। তারা যখন সেখানে যাবে, আমি তাদের শেখাব কীভাবে মুন্নু এগিয়ে গিয়েছিল। আমার শেখাতে কোনো অসুবিধা নেই।

তখন তারা বলছেন, আপনি এখানে বলেন না কেন? কিন্তু আপনি যদি শিল্প ও সংস্কৃতি শিখতে যান, আপনাকে মিলান যেতে হবে, প্যারিসে যেতে হবে। টাইলস ও স্যানিটারির পণ্য ইতালির। সেখানে আপনাকে যেতে হবে। এরপর আমেরিকা যেতে হবে।

আশা করি তারা আমার এ অনুরোধ রাখবেন। আমরা শিগগির যাচ্ছি। ইতালিতে একটি মেলা হচ্ছে। ইতালিয়ান সরকার সেটির পৃষ্ঠপোষকতা করছে। সেখানে আমার সঙ্গে দু-একজন মালিকও যাচ্ছেন।

সিরামিক রফতানির বড় বাজার কি ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র?

আমাদের জন্য। টাইলস, স্যানিটারি ওয়্যার, টেবিলওয়্যার, ব্রিকস। আমাদের দেশে একটা ফ্যাক্টরি আছে। এত সুন্দর কাজ করছে! আগে রায়েরবাজারে পোড়ামাটি দিয়ে কাজ হতো, সেই পোড়ামাটির কাজ, টেরাকোটা। তারপর হাতিগঞ্জের টাইলস আছে। আমি উনাকে বললাম, আপনি এখনো বিদেশে যান না কেন?

এখন অনেকেই বলেন এফডিআই আসছে না, এফডিআই আসছে না। আমি বললাম, ঠিক আছে, এফডিআই আসছে না। আমি ধরে নিলাম এফডিআই এল না। কিন্তু আমাদের গ্রামে গ্রামে যে শক্তিটা আছে, সেটা দেখতে হবে। আড়ং আর ব্র্যাক খুবই ক্ষুদ্র একটা এফোর্ট নিয়ে কিন্তু হাতে তৈরি কাজগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে। আজকে গ্রামে গ্রামে কুমার শিল্প আছে, কামার শিল্প আছে। একটা উদাহরণ দিই, স্টাফ টয়েজ। মানে, আমার শৈশবে দেখেছি, আমার বোনেরা পুতুলটা হাত দিয়ে বানাত। আমার মাকেও দেখেছি সুন্দর জাপানি ডল বানাতে শিখেছিলেন, বানাতেন। কিন্তু আমরা যদি আজকে গ্রামে গ্রামে তৈরি হওয়া এ স্টাফ টয়েজগুলো নিয়ে যাই, আমরা যারা বড় বড় ইম্পোর্টার, সব ম্যাটেরিয়াল নিয়ে এলাম, আর কাজটা শিখিয়ে দিলাম। শুধু খুব ছোট ছোট মেশিন লাগে। যেমন ভেতরে তুলা ভরার জন্য বা ফাইবার ভরার জন্য যে মেশিনটা লাগে, সেটা খুবই ছোট। খুব বড় কিছু লাগে না। কুটির শিল্পটা, মানে যেটাকে আমরা এসএমই বলি। সবাই আছে বড় বড় শিল্প করব। কিন্তু এ এসএমইকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আপনাকে বাইরের কেউ টাকা দেবে না, যতক্ষণ না আপনি দেখাবেন আপনি কীভাবে টাকা বানাচ্ছেন।

এখন বিদেশীরা কিন্তু এসেছে। গার্মেন্টস এসেছে। আমরা যখন বানানো শুরু করলাম, তখন কিন্তু বাটা এখানে এসেছিল। একসময় বাটা কিন্তু এখানে এসেছিল, জুতা বানানো শিখিয়েছিল। এপেক্স এল। এখন কিন্তু অনেক জুতা তৈরি হচ্ছে, বিদেশী পার্টনার আসছে। আজকে আপনি দেখবেন, অনেক চাইনিজ এসেছে।

আপনি যখন বানানো শিখাবেন, পারবেন, তখন তারা আসবে। এখন এফডিআই কী জন্য, কী কারণে আসবে এ দেশে? গ্যাস নেই, ব্যাংকে টাকা নেই। রিসেন্টলি তো সিকিউরিটি একটা ওয়ার্নিংও আমেরিকা দিয়ে দিয়েছে। মানে, এটা তো আমাদের জন্য আরেকটা মাথাব্যথা হয়ে গেছে। উনারা ওয়ার্নিং ইস্যু করে দিয়েছেন।

আপনারা নিজেরা, অন্যরা, এখন তৃতীয় প্রজন্ম ব্যবসায় ঢুকেছে। আপনার সন্তানরা পরিচালনা করছেন। এ তরুণদের আপনারা প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে কীভাবে তৃতীয় প্রজন্মে রূপান্তর করছেন? সেই অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

আপনি প্রথমে বলেছেন, তৃতীয় প্রজন্ম এসেছে। দ্বিতীয় প্রজন্মে যেভাবে আমরা কাজ শিখেছি, আমি সবসময় সেটাতে বিশ্বাস করি। আপনি প্রথমে আপনার সন্তানকে মাঠপর্যায়ের কঠিন কাজ করতে দেবেন। যখন সে আগে কঠিন কাজ করবে, তখন সে শিখে যাবে এটা কীভাবে করতে হয়।

আমি দেখেছি গার্মেন্টসে দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্ম। টেক্সটাইলে তৃতীয় প্রজন্ম দেখেছি। ফার্মাসিউটিক্যালে তৃতীয় প্রজন্ম দেখেছি। সিরামিকে তো দেখলাম।

সব বাবাই কিন্তু প্রথমে মাঠপর্যায়ে পাঠিয়েছেন। যারা টিকে গেছে, তারা টিকে গেছে। আর যাদের আগে মাঠপর্যায়ের কাজ শেখানো হয়নি, সেখানে ব্যর্থতা আছে।

আমি আশা করি, একসময় আমাদের দেশে যারা আমলা আছেন, তারা তাদের ছেলে-মেয়েদেরও বাইরে থেকে ফিরিয়ে আনবেন। তখন তারা এ দেশের সমস্যাগুলো তাদের ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমে জানতে পারবেন।

আমি যখন পাকিস্তান আমলের সিএসপি কর্মকর্তাদের ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করি, তারাও যেমন নেই, বাংলাদেশের আমলাদের ছেলে-মেয়েরাও দেশে নেই। খুবই হাতেগোনা কয়েকজন আছেন। যারা আছে, তাদের বেশির ভাগই ব্যাংকে আছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে যদি চিন্তা করি, তাহলে তো একজন সিএসপি শুরু করেন...

ওই একজন সিএসপি আর আমজাদ সাহেব একজন ব্রিগেডিয়ার। আপনি হাতেগোনা এমন পাবেন। আমি তার পরও তাদের অনেক ধন্যবাদ দিই যে তারা এসেছিলেন।

১৯৮০ বা ১৯৯০-এর পরে, আমার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন বা যারা ট্যাক্সেশনে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের সন্তান দেশে নেই।

আমি তাদের হেসে হেসে বলি, তোমাদের সন্তানদের তোমরা দেশে রাখনি। এ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমাদের আসলে মাথাব্যথা কীভাবে হবে।

আজকে সবাই চিন্তা করে, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াব, বিদেশে পাঠিয়ে দেব।

আপনি নতুন প্রজন্মের তরুণদের কী বার্তা দেবেন?

আমি দেখেছি তরুণ প্রজন্ম এমন অনেক কিছু করছে, যা আমরা চিন্তাই করতে পারিনি।

এজন্য সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ থাকবে, আপনারা একটি জ্বালানি সমাধান নিয়ে আসেন। আর পরবর্তী সময়ে যারা আসবে, তাদেরও বলব, টেকসই সমাধান যেটা হবে, আপনারা সেটার ওপরই থাকবেন। এখন তো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। এরপর যেন আর পরীক্ষা না হয়।

আরও