কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৬ টাকার বেশি। এর সঙ্গে রয়েছে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়। বর্তমানে এক কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও বিক্রি হচ্ছে না কৃষি পণ্যটি। বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করে ফিরতে হচ্ছে চাষীদের।
গত বছর ১০ হাজার টাকা লোকসান হলেও এ বছর লাভের আশা করেছিলেন নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের খলসি গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন। নিজের এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। আশা করেছিলেন আলু বিক্রির টাকায় ঈদে পরিবারের সদস্যদের নতুন জামা কিনে দেবেন। তবে তার সে আশা ফিকে হয়ে যায় উপজেলা সদরের হাটে গেলে। প্রথম ধাপে জমি থেকে উত্তোলন করা ৩০ মণ ডায়মন্ড আলু বিক্রি করতে গিয়ে পাইকারদের হাঁকানো দাম শুনে রীতিমতো চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ঘাম ঝরিয়ে ফলানো আলু ৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হয়েছে। পাইকাররা শুরুতে ৫ টাকা দাম হাঁকলেও শেষ পর্যন্ত ৬ টাকা কেজি দরে কিনেছে। কীটনাশক ব্যবহার না করায় এক বিঘা জমিতে এ বছর আলুর আবাদে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এক বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ৮০ মণ আলু পাওয়া যায়। ন্যায্য দাম না পেলে এরপর মাঠেই আলু ফেলে রেখে নষ্ট করব।’
নওগাঁ সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের কীর্ত্তিপুর গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ে। শুধু কৃষকের ফসলের দাম কমে যায়। মাত্র ৫ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি হওয়াটা কৃষকের সঙ্গে প্রহসন। আমরা ভিক্ষা চাই না, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম চাই। সরকার যদি কৃষককে বাঁচাতে এগিয়ে না আসে, তাহলে কৃষিপণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’
বদলগাছী উপজেলার দেউলিয়া গ্রামের আরেক কৃষক হাসান আলী বলেন, ‘এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। বাজারে দাম শুনে মাঠ থেকে আলু উত্তোলনের সাহস পাচ্ছি না। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী বীজ-সারের দামই উঠছে না। লোকসান গুনতে গুনতে এ বছর আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সরকারিভাবে ন্যায্য দামে আলু কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো আগামী বছর থেকে আলু চাষ পুরোপুরি বন্ধ করে দেব।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই আলু চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। আলুর পরিবর্তে সরিষা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হলেও কৃষক সেটি মেনে চলেননি। গত বছর আলুর বীজ কৃষকদের ঘরে ঘরে সংরক্ষণ করা ছিল। সেই বীজের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষক সংকটের মুখে পড়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘অনুকূল আবহাওয়ায় আলুর উচ্চ ফলন পেয়েছেন চাষীরা। সেটাই এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যায্য দাম পেতে কৃষকদের আলু সংরক্ষণের পরামর্শও দিতে পারছি না। কারণ সংরক্ষণের পর আদৌ তারা ন্যায্য দাম পাবেন কিনা সেটি আমরা নিশ্চিত নই।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আবাদ হয়েছে ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে। আবাদকৃত জমি থেকে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমির আলু উত্তোলন করা হয়েছে। যার ফলন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ১৬৫ টনে।
আলুর বাজার দরের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আলুর দরপতন রোধে করণীয় সম্পর্কে কৃষি বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে। আজ এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’