বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ

মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি কোনো সরকারই

ভূমধ্যসাগরের বুকে ভাসছে ছোট্ট একটি নৌকা। আর তাতে গাদাগাদি করে বসে আছেন শতাধিক মানুষ, যাদের অনেকেই বাংলাদেশের তরুণ।

লিবিয়ার উপকূল থেকে তারা রওনা হয়েছেন। লক্ষ্য ইউরোপে প্রবেশ। বছরের পর বছর ধরে এটি এক পরিচিত চিত্র। এ যাত্রায় সফল হয়ে অনেকে প্রবেশ করছেন ইতালি কিংবা গ্রিসে। আবার অনেকের ঘটছে সলিলসমাধি। গত মার্চেও লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জনের বাড়িই সুনামগঞ্জ জেলায়।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, চলতি বছর কেবল প্রথম ছয় মাসেই অবৈধ উপায়ে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশী। একই সময়ের মধ্যে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন আরো ৩ হাজার ৬০৮ জন।

প্রতি বছরই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সময় অনেক তরুণ হারিয়ে যান সাগরের অতলে, নয়তো দুর্গম জঙ্গলে। আর এ পুরো যাত্রার নেপথ্যে থাকে মানব পাচারকারী চক্রের সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক। গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স গত বছর জানিয়েছিল, বাংলাদেশে মানব পাচারই সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। একদিকে মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভন, অন্যদিকে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপের অভাবে কমছে না মানব পাচারের ট্র্যাজেডি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ দমন আইনে মামলা হলেও অপরাধীদের কঠোর সাজা নিশ্চিত না হওয়া এবং মূল হোতারা অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

মানব পাচার শুধু যে জীবন কেড়ে নিচ্ছে কিংবা একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তা-ই নয়। এ কারণে ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশীদের ভ্রমণ গন্তব্য। ক্রমাগত অবনমন ঘটছে বাংলাদেশী পাসপোর্টের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের গত সপ্তাহে প্রকাশিত সূচকের তথ্য বলছে, এখন বাংলাদেশ ও উত্তর কোরিয়ার পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া কিংবা ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে বিশ্বের ৩৫টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন; যদিও বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা গত বছর আগাম ভিসা ছাড়া বিশ্বের ৩৭টি দেশে ভ্রমণ করতে পারতেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ওপর ভিসা কড়াকড়ি, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়াসহ স্টুডেন্ট ভিসায় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ার পেছনে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মানব পাচার ইস্যু। এ ঘটনা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে।

মানব পাচার বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য ভিসা জটিলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার সংকুচিত করছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রেও আরোপ করা হচ্ছে বাড়তি কড়াকড়ি। গত কয়েক বছরে ভিয়েতনামে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যাওয়া বাংলাদেশীদের অনেকে আর দেশে ফেরেননি। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে তাদের অনেকেই অবৈধ পথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাড়ি জমিয়েছেন। এমন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দেয় ভিয়েতনাম।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং মেট্রিক্সের তথ্যমতে, চলতি বছর ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্থল ও সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছেন ৭ হাজার ৯৬৯ বাংলাদেশী। আইওএম ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেশন স্ন্যাপশট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশী, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩০৪। ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩ জন, ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৪৮৭ এবং ২০২১ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৭ হাজার ৯৫৫ ও ৪ হাজার ৫১০ জন। অনিয়মিত পথে ইউরোপে পাড়ি জমানো এসব বাংলাদেশীর বেশির ভাগই মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।

ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশীরাই সবচেয়ে বেশি। এ পথটি সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট নামে পরিচিত। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ পথে অবৈধভাবে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেবল ইতালি নয়, চলতি ২০২৬ সালে এসে সাগরপথে গ্রিসে অবৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশীরা তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশে এ অবৈধ যাত্রা শুরু হয় গ্রামের পরিচিত কোনো ব্যক্তি, আত্মীয় বা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে। ‘ইতালিতে ভালো চাকরি’, ‘মাত্র ছয় মাসে লাখ লাখ টাকা আয়’, ‘ভিসার ঝামেলা নেই, ‘সব দায়িত্ব আমাদের’—এ ধরনের চটকদার প্রতিশ্রুতি এখন অনলাইনেও সয়লাব। মানব পাচারকারীদের এসব আশ্বাসে অনেকেই বিশ্বাস করেন।

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যেতে চেয়েছিলেন গাজীপুরের মো. মাসুম মোল্লা। ২০২৪ সালে একটি এজেন্সি তাকে ইতালি পাঠানোর নাম করে শুরুতে পাঠায় দুবাই। সেখান থেকে মিসর হয়ে সরাসরি লিবিয়ায় পাচার করে স্থানীয় মাফিয়া চক্রের কাছে তাকে বিক্রি করে দেয়া হয়। জিম্মিদশা থেকে তাকে উদ্ধার করতে পরিবারের প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। এজেন্সি ও দালালের বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় দায়ের করা মাসুম মোল্লার মানব পাচারের মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে সরকার ২০১২ সালে আইন প্রণয়ন করার পর থেকে মানব পাচার আইনে নিয়মিত মামলা হলেও সাজা পাওয়া পাচারকারীর সংখ্যা এখনো কম। অনেক ক্ষেত্রে আসামি খালাসও পেয়ে যাচ্ছে। এদিকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘অভিবাসী চোরাচালান’-সংক্রান্ত অপরাধকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ আইনেও একক ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।

মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারের সময়ে শক্ত পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানব পাচারের মামলায় মোট ২৫ হাজার ৫৫৪ জনকে আসামি করা হলেও সাজা হয়েছে মাত্র ২০০ জনের। এর মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন ৩০ জন। ২০১৯ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন আসামির বিপরীতে সাজা হয়েছে ২৫ জনের, ২০২০ সালে ২ হাজার ১৯৯ জনের মধ্যে মাত্র একজনের। ২০২১ সালে ২ হাজার ৮৮৯ জন এবং ২০২২ সালে ২ হাজার ৭০০ জনকে আসামি করা হলেও ওই দুই বছরে একজনেরও সাজা হয়নি। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৫১৩ জন আসামির বিপরীতে সাজা হয়েছে ৭১ জনের, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৬৩৯ জনের মধ্যে ৬০ জনের এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৬৯৬ জন আসামির মধ্যে মাত্র ২৮ জনের। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ২ হাজার ২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ সময়ে সাজা হয়েছে ১৫ জনের।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচার মামলা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে, কেবল ২০২৫ সালেই মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে নতুন করে ১ হাজার ১২৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আগে জমে থাকা মামলাসহ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আদালতে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৪টিতে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্তকাজ এখনো শেষ করতে পারেনি পুলিশ ও সিআইডি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে নতুন করে ৭১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬, মার্চে ১১০, এপ্রিলে ১৩০ এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে ৪৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালে বা চলতি বছর এখন পর্যন্ত অল্প কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা পাওয়া গেছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ ইউরোপযাত্রায় যাওয়া বেশির ভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। বিশেষ করে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ দেশের ১০ থেকে ১২টি নির্দিষ্ট জেলার যুবকরা এতে বেশি প্রলুব্ধ হচ্ছেন। বর্তমানে পাচারকারীরা সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপকে প্রলোভন দেখানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রতারণা বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা দেশে ফিরে আইনি আশ্রয় নিলেও মূল পাচারকারীরা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করা বাংলাদেশীদের বেশির ভাগই মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। যাত্রাপথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ লিবিয়ায় গেছেন। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখানো হলেও ৭৫ শতাংশ কোনো চাকরি বা কাজ পাননি। উল্টো তাদের বন্দিদশায় থাকতে হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এত কিছুর পরও ইউরোপের স্বপ্নে লিবিয়া যাওয়ার এ প্রবণতা থামছে না।

অপহরণের পর সাগরপথে মানব পাচারের শিকার হন টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের। তিনি বলেন, ‘হাত-পা বেঁধে, চোখ ঢেকে আমাকে শামলাপুরের একটি পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনদিন আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে মেরিন ড্রাইভ উপকূল থেকে ছোট নৌকায় করে গভীর সাগরে নিয়ে একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ মানুষ গাদাগাদি করে ছিল। এরপর মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় নেয়া হয়।’

শুধু আইন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি বলে মনে করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তিনি বলেন, ‘মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের মতো অপরাধ দমন করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচারের ঘটনায় মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং পাচারের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। মানব পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’

অভিবাসন নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানব পাচার কেবল সরকারের একক ব্যর্থতা বা একটি দেশের দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক ও সামগ্রিক ব্যবস্থার জবাবদিহিহীনতার প্রতিফলন। প্রলোভনে পড়ে মানুষের স্বেচ্ছায় গোপন পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা রোধে রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বৈধ পথে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে মানব পাচারের বিচার ব্যবস্থায় সাক্ষীর সুরক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মানব পাচার ও অভিবাসন আইন অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আইনজীবীরা সঠিক মামলা ফাইল করতে পারছেন না, ফলে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাচারকারী সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে বাংলাদেশ একাকী এটি প্রতিরোধ করতে পারবে না; তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ সংকটের সমাধান সম্ভব।’

মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন পুরোপুরি রুখে দিতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউরোপে পাঠানোর নামে ফেসবুকে যারা চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তারা মূলত প্রতারক চক্র। তাদের বিরুদ্ধে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ধরনের কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এসব ভুয়া বিজ্ঞাপনদাতা ও মানব পাচারকারী চক্রকে দমনে বিএমইটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে খুব দ্রুতই মাঠে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হবে।’

মো. নুরুল হক আরো বলেন, ‘অবৈধ প্রক্রিয়ায় জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সি ও ভুয়া চটকদার বিজ্ঞাপনদাতাদের চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। যেসব সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, সেই এলাকাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক সভা ও প্রচারণা চালানো হবে।’

বর্তমান সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে “‍জিরো টলারেন্স” নীতি অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবেলায় সরকার গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করা, মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

মানব পাচার প্রতিরোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘মানব পাচার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিরাপদ, নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে বাংলাদেশী নাগরিকরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের সুযোগ পায় এবং মানব পাচারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকে।’

আরও