যদিও ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, পান্থপথ, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার বাসিন্দারা সে সুফল পাচ্ছে না। মূলত পান্থপথ বক্স কালভার্ট উন্মুক্ত করার পাশাপাশি পৃথক পয়োবর্জ্য সংযোগ না থাকার কারণেই এসব এলাকা অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে জলাবদ্ধতা নিরসনে সোনারগাঁও স্লুইসগেট উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথক পয়োবর্জ্য সংযোগ তৈরি না করা পর্যন্ত এসব এলাকার জলাবদ্ধতার টেকসই সমাধান হবে না।
হাতিরঝিল প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঝিলটি বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। মোট ১০টি পথে আশপাশ এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি এ ঝিলে এসে পড়ার কথা। ঝিল থেকে রামপুরা খাল হয়ে পানি চলে যাবে বালু নদীতে।
কিন্তু হাতিরঝিল লেকের পুরো সুবিধা পাচ্ছে না বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, ধানমন্ডির বাসিন্দারা। সরজমিনে দেখা যায়, সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশ দিয়ে হাতিরঝিলে ঢুকছে কলাবাগান, গ্রিন রোড, পান্থপথ, কাঁঠালবাগান, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, সোবহানবাগ, তল্লাবাগ এলাকার পানি ও পয়োবর্জ্য। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব এলাকার সড়ক ও গলিপথে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, পয়োবর্জ্যের কারণে দুর্গন্ধে ওই এলাকার আশপাশে টেকা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধানমন্ডি থেকে শুরু করে কলাবাগান, গ্রিন রোড, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার এলাকা তুলনামূলক নিচু। এ কারণে বৃষ্টি হলে সহজেই ডুবে যায়। এসব এলাকায় বৃষ্টির পানি যাওয়ার ড্রেন (স্টর্ম ড্রেনেজ) থাকলেও নেই পয়োবর্জ্য সংযোগ। ফলে এ ড্রেনগুলো একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি ও পয়োবর্জ্য সংযোগ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এবং ময়লা পানি পড়ছে হাতিরঝিলে। এতে শুধু যে জলাবদ্ধতাই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে তা নয়, বরং হাতিরঝিলের উদ্দেশ্যটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সোনারগাঁও স্লুইসগেটটি উন্মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, ডিএসসিসি এলাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম হটস্পট ধানমন্ডি, পান্থপথ ও গ্রিন রোড এলাকা। বৃষ্টি হলে এসব এলাকা থেকে পানি নামতে কখনো কখনো একদিনের বেশি সময় লেগে যায়। এ কারণে সিটি করপোরেশন ভাবছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সঙ্গে সমন্বয় করে বর্তমান স্লুইসগেটটি উন্মুক্ত করবে। বৃষ্টি হলে দ্রুততম সময়ে পানি এখানে এসে জমা হবে। আর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের পেছনের জলাশয় রিটেনশন বেসিন হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ডিএসসিসি সূত্র আরো জানায়, বিদ্যমান স্লুইসগেটটি আগে যেখানে বিজিএমইএ ভবন ছিল সেখানে স্থাপন করা হবে। বর্ষাকালে যদি পানির প্রবাহ খুব বেশি হয় তাহলে বিকল্প পথ হিসেবে এটি খুলে দেয়া হবে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাতিরঝিল বানানো হয়েছে বৃষ্টির পানিধারণের জন্য। কিন্তু এখন সেখানে সুয়ারেজ বর্জ্য যাচ্ছে। তাই ওইসব এলাকার নাগরিক সমস্যা দূর করার জন্য সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক নির্মাণের বিকল্প নেই।’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা ওয়াসা ও ডিএসসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে হাতিরঝিল লেক ও এর আশপাশে যেকোনো পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘হাতিরঝিল লেক নির্মাণ হয়েছে বৃষ্টির পানিধারণের জন্য। কিন্তু সেখানে এখন সুয়ারেজ বর্জ্য যায়। বর্ষার সময় বৃষ্টির পানিও যায়। সিটি করপোরেশন এককভাবে যদি স্লুইচগেট ভেঙে ফেলতে চায় বা স্থানান্তর করতে চায় তবে এ সিদ্ধান্ত আরো বিধ্বংসী হবে। আশপাশ এলাকার মানুষের পয়োবর্জ্য সমানে হাতিরঝিল লেকে পড়ছে। যেহেতু বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের আর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসার, তাই দুই পক্ষকেই সমন্বয় করে পৃথক সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে হাতিরঝিলকে দূষণ থেকে বাঁচাতে হবে, আবার ধানমন্ডি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজারের মানুষকেও জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হবে।’
ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেটে জলাবদ্ধতা দূর না হলেও হাতিরঝিল প্রকল্পকে ব্যর্থ বলা যাবে না বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তার মতে, প্রকল্পটির মূল সীমাবদ্ধতা হাতিরঝিল নয়; বরং আশপাশ এলাকার সঙ্গে ঝিলের কার্যকর সংযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির পানি নিরবচ্ছিন্নভাবে হাতিরঝিল লেকে এসে পড়ার মতো সংযোগ অনেক জায়গাতেই নেই। যদি সংযোগগুলো ঠিকঠাক তৈরি করা যায়, তাহলে হাতিরঝিল ভালো ফল দেবে। সোনারগাঁও স্লুইসগেট যদি উন্মুক্ত করে দেয় তাহলে কোনো অসুবিধা দেখছি না। তবে রামপুরার দিকে বড় এলাকা নিয়ে নতুন করে স্লুইসগেট করলে আশা করি ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা করছি ঢাকা ওয়াসা, রাজউক ও ডিএসসিসির সমন্বিত উদ্যোগে কীভাবে ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, পান্থপথ ও কারওয়ান বাজারের জলাবদ্ধতা দূর করা যায়। এজন্য আমরা সোনারগাঁও স্লুইসগেটটি ওপেন করে দেয়ার কথা ভাবছি।’
তিনি বলেন, ‘এখানে দুটি বক্স কালভার্ট আছে। একটা হলো পান্থকুঞ্জ বক্স কালভার্ট, আরেকটা পরীবাগ বক্স কালভার্ট। কিন্তু স্লুইসগেট একটি। এ কারণে বৃষ্টি হলে দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে বৃষ্টির পানি আরো কম সময়ে নামিয়ে আনা যায়। এ লক্ষ্যে আমরা কিছু উদ্যোগও নিচ্ছি।’