সাফারি পার্কের দুর্লভ প্রাণীদের নেই ডিএনএ প্রোফাইলিং, পাচার হওয়া লেমুর ফেরানো নিয়ে শঙ্কা

সহায়তা চেয়ে ইন্টারপোলকে সিআইডির চিঠি

আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত প্রাণীর ক্ষেত্রে শুধু খাঁচা, রেজিস্টার বা পাহারাদার দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। প্রতিটির জন্য প্রয়োজন হতে পারে স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। মাইক্রোচিপ, ইউনিক আইডি, ছবি, শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত নথি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ থাকলে কোনো প্রাণী চুরি বা পাচার হলে তার পরিচয় প্রমাণ করা অনেক সহজ হয়

সাফারি পার্কে থাকা কোনো প্রাণী শুধু খাঁচাবন্দি একটি বন্যপ্রাণী নয়। আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এসব প্রাণীর প্রতিটির রয়েছে আলাদা পরিচয়, উৎস ও মালিকানার ইতিহাস। তার কোনোটি চুরি বা পাচার হয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে গেলে সেটি ফিরিয়ে আনতে এসব তথ্যের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানেই বড় ধরনের দুর্বলতার মুখে পড়েছে গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ।

পার্কে থাকা দুর্লভ ও মূল্যবান প্রাণীগুলোর নেই কোনো জেনেটিক বা ডিএনএ প্রোফাইল। মাইক্রোচিপ, ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও নেই। ফলে চুরি বা পাচারের শিকার হওয়া কোনো প্রাণীর সন্ধান মিললেও সেটি যে গাজীপুর সাফারি পার্কেরই—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে গত বছরের মার্চে চুরির পর পাচার হওয়া এক জোড়া অতি দুর্লভ রিংটেইল লেমুরকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে গিয়ে বিষয়টি সামনে আসে। প্রাণী দুটি বর্তমানে প্রতিবেশী একটি দেশে থাকার তথ্য পাওয়ার পর এগুলো শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে তদন্তের শুরুতেই দেখা দেয় বড় বাধা—প্রাণী দুটির পরিচয় নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় একটি প্রাণীর পরিচয় শুধু তার প্রজাতি, বয়স বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার জন্ম, উৎস, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও জেনেটিক তথ্যও সংরক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত প্রাণীর ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইল ও স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা মালিকানা নির্ধারণ, পাচার ঠেকানো এবং উদ্ধার হওয়া প্রাণীকে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। যদিও গাজীপুর সাফারি পার্কে এমন কোনো সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে উদ্ধার হয় বিপুলসংখ্যক বিরল পাখি ও প্রাণী। তালিকায় ছিল লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূর ও আফ্রিকান লেমুর। পাখি হিসেবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল সেগুলোকে। পরে উদ্ধার হওয়া প্রাণীর একটি অংশ পাঠানো হয় গাজীপুর সাফারি পার্কে।

সেই চালানেই ছিল সাইটসের অ্যাপেন্ডিক্স-১ তালিকাভুক্ত এক জোড়া রিংটেইল লেমুর। গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকাকালীন এ জোড়ার দুটি শাবকও জন্ম নেয়। পরে একটি লেমুর মারা যায়। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি সময়েও এসব প্রাণীর কোনো ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়নি। এমনকি মাইক্রোচিপ বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইউনিক শনাক্তকরণ নম্বরও ছিল না।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হয়। পরদিন থানায় অভিযোগ দেয়া হলেও মামলা রুজু হয় ৬ এপ্রিল।

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, পার্কের এক আউটসোর্সিং নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় লেমুরগুলো চুরি করা হয়েছিল। বস্তায় ভরে সেগুলো রাখা হয় একটি বাড়িতে।

সেখান থেকে প্রাণীগুলোর ভিডিও ধারণ করে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়। একপর্যায়ে হাতবদল হয়ে লেমুরগুলোর দুটি দেশের বাইরে পাচার হয়ে যায়। প্রতিবেশী একটি দেশের বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেমুর জোড়ার ছবি প্রকাশ করলে বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। সেগুলো দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিন্তু তখনই সামনে আসে বড় প্রশ্ন—বিদেশে থাকা প্রাণী দুটি যে গাজীপুর সাফারি পার্কের সেই লেমুর, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কী?

লেমুরগুলোর কোনো সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনা না থাকায় তদন্তকারীরা এখন ভিন্ন পথে এগোচ্ছেন। সাফারি পার্কে থাকা একই পরিবারের একটি শাবকের ডিএনএ সংগ্রহ করে পাচার হওয়া দুটি লেমুরের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে প্রাণীগুলোর পরিচয় পাঁচ বছর ধরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকার পরও নথিভুক্ত করা হয়নি, এখন সেগুলোর পরিচয় উদ্ধার করতে গিয়ে অন্য একটি প্রাণীর জেনেটিক তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তদন্তকারীদের।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশ থেকে দুর্লভ পাখি ও প্রাণী চুরির সঙ্গে একটি শক্তিশালী চক্র জড়িত। এ চক্রের আনুমানিক চার শতাধিক সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করে। এর মধ্যে চোরাকারবারিদের বড় একটি অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুর্লভ মৃত প্রাণী মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে দেশে আমদানি করে। পরবর্তী সময়ে সেগুলো পার্কের জীবিত প্রাণীর সঙ্গে বদল করা হয়। আবার কখনো চুরির আশ্রয়ও নেয় চক্রের সদস্যরা।

গাজীপুর সাফারি পার্কে কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের বড় একটি অংশই এ চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তারা মূলত পাখি ও প্রাণীগুলোকে চুরির সুযোগ তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি সাফারি পার্কের আশপাশে বাড়ি, এমন কিছু ব্যক্তিও এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত। চুরির পর তারা পাখি ও প্রাণীগুলো নিজেদের হেফাজতে রাখে। চক্রের আরেকটি দল পরবর্তী সময়ে সেগুলোর ভিডিও করে বিদেশের চোরাকারবারিদের কাছে পাঠায়। কোনো প্রাণী পছন্দ হলে চলে দরদাম। এরপর নিরাপদে সেগুলো সীমান্ত দিয়ে পাচার করে দেয়া হয়।

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া তিনটি লেমুরের মধ্যে একটি গত বছরের ১৭ এপ্রিল উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় দেলোয়ার হোসেন তওসীফ নামের এক পাচারকারীকে গ্রেফতারও করা হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আরো ছয়জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায় সিআইডি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লেমুর বিক্রির অর্থের তথ্যও পাওয়া গেছে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবকের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৭ লাখ টাকা। আরেকটি শাবকের মূল্য ধরা হয়েছিল ৩ লাখ টাকা। পরে দুটি লেমুর চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ঘটনাটি শুধু একটি সাফারি পার্ক থেকে প্রাণী চুরির ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমান্তপথে বন্যপ্রাণী পাচার, দেশী-বিদেশী ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগসূত্র। ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ বন্যপ্রাণী চোরাকারবারি হাদিসুর রহমানকে লেমুর চুরির মামলায় গ্রেফতারের পর তার স্ত্রী খুশী বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পাচারের নেপথ্যের বেশকিছু তথ্য দেন।

লেমুর চুরির মামলাটি শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক সুনীল দাস। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অতি দুর্লভ লেমুর দুটি চুরি ও পাচারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র রয়েছে। পাশাপাশি দেশেও স্থানীয় একটি চক্র তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে। তদন্তে লেমুর চুরি, পাচারের রুট ও চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। এর ভিত্তিতে ইন্টারপোলের কাছেও সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু ডিএনএ প্রোফাইলিং ও স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকায় লেমুর দুটি ফেরানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

দুর্লভ লেমুর চুরির ঘটনা শুধু সাফারি পার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই সামনে আনেনি, প্রশ্ন তুলেছে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কাঠামো নিয়েও। বিশ্লেষকদের মতে, একটি সাফারি পার্ক বা চিড়িয়াখানায় প্রাণী সংরক্ষণ মানে শুধু তাদের খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা নয়। প্রতিটি মূল্যবান ও দুর্লভ প্রাণীর জন্ম, উৎস, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও জেনেটিক তথ্য সংরক্ষণও আধুনিক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত ও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীর ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য স্বতন্ত্র পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ কোনো প্রাণী চুরি বা পাচার হয়ে দেশের বাইরে চলে গেলে তাকে শনাক্ত করার পাশাপাশি সেটি কোত্থেকে এসেছে এবং কার অধীনে ছিল—এসবও প্রমাণ করতে হয়। একই প্রজাতির একাধিক প্রাণীর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা একই হওয়ায় শুধু ছবি দেখে তার উৎস নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব নয়।

সংরক্ষণের শুরুতেই দুর্লভ প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং ও স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ সহযোগী অধ্যাপক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্লভ প্রাণী চুরি বা পাচার হলে পরে সেটি শনাক্ত করার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন হয়। শুরুতেই যদি প্রাণীগুলোর ডিএনএ প্রোফাইলিং ও স্বতন্ত্র পরিচয় সংরক্ষণ করা থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের উৎস ও মালিকানা প্রমাণ করা সহজ হয়। সেই সঙ্গে প্রতিটি প্রাণীর জন্য একটি সমন্বিত বৈজ্ঞানিক ডেটাবেজ থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রাণীর পরিচয়, উৎস, জন্ম, প্রজনন, স্বাস্থ্যগত ইতিহাসের পাশাপাশি জেনেটিক তথ্যও সংরক্ষণ করা উচিত।’

ড. তৌহিদুল হক আরো বলেন, ‘মাইক্রোচিপ, জেনেটিক প্রোফাইলিং ও অন্যান্য আধুনিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তপথে বন্যপ্রাণী পাচার ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এবং দেশের ভেতরে সক্রিয় পাচারকারী চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এসব অপরাধ আরো বাড়বে।’

আরও