কয়েকদিন ধরেই মানুষে জমজমাট আখড়াবাড়ি। কেউ এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে, কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন দেশের সীমানা। কারো হাতে বই, কারো কাঁধে একতারা, কেউ আপনমনে গুনগুন করছেন লালনের গান। লালনের তিরোধান দিবসের সঙ্গ ঘিরে রসিকজনদের ভাবের ঘরে টোকা পড়েছে। আর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ছেঁউড়িয়ার আকাশ-বাতাসে ভেসে আসে অতিপরিচিত কথা ও সুর— সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে বা জাত গেল জাত বলে একি আজব কারখানা। গানের সঙ্গে যেন মিশে যায় অচেনা-অজানা মানুষের কণ্ঠ, অনুভূতি আর লালনে দর্শন।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন তিরোধান দিবসের তিনদিনব্যাপী আয়োজনে এমনই এক আবহ তৈরি হয়েছে। লালনভক্ত, বিভিন্ন ঘরানার ভাবুক-সাধক, লেখক, গবেষক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি। শুধু গান শোনা কিংবা উৎসবের অংশ হওয়া নয়, লালনের দর্শনকে নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেই যেন এখানে ছুটে এসেছেন তারা
স্মরণোৎসবে আসা অনেকের কথায় উঠে এসেছে লালনের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, জাত-পাত ও ভেদাভেদহীন সমাজের স্বপ্ন এবং সহজ-সরল ভাষায় গীত গানের মর্মবাণী। তাদের মতে, শত বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও লালনের দর্শন আজও মানুষের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক। বরং বর্তমান সময়ে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার বাস্তবতায় লালনের মানবতাবাদী চিন্তার গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
সম্মিলিত আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক কারশেদ আলম বলেন, ‘লালন শুধু গান লিখেছেন বা গেয়েছেন বিষয়টি এমন নয়। তার গানের মধ্যে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে শিক্ষা রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এসে মনে হয়, ধর্ম-বর্ণ কিংবা পরিচয়ের আগে আমরা সবাই মানুষ।’
তার পাশেই ছিলেন ফকির আরেফিন উদ্দিন। এ লালন গবেষক গাজীপুর থেকে এসেছেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের কাছে লালনের গান পৌঁছানোর অন্যতম কারণ ভাষা। আরেফিন বলেন, ‘লালন কঠিন ভাষায় দর্শনের কথা বলেননি। গ্রামের মানুষের মুখের ভাষায়, পরিচিত শব্দে তিনি জীবনের গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। তাই তার গান শুনলে মনে হয় কথাগুলো আমাদেরই কথা।’
তিন দিনের এ আয়োজনে বিদেশী দর্শনার্থীদেরও দেখা গেছে। কেউ গবেষণার কাজে এসেছেন, কেউ লালনের দর্শনের অনুসারী হয়ে বারবার ছুটে আসেন ছেঁউড়িয়ায়। তাদের অনেকের কাছে লালন শুধু একজন সাধক নন; তিনি নিজেই একটি দর্শন, একটি জীবনবোধ।
ফকির লালন শাহর ওপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন এসএস রুশদী। তার ভাষায়, ‘লালনকে শুধু বাউলগানের শিল্পী হিসেবে দেখলে তার বিশালত্বকে ছোট করে দেখা হয়। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মানুষের পরিচয় নিয়ে, জাতের বিভাজন নিয়ে, সামাজিক বৈষম্য নিয়ে। তার সেই প্রশ্নগুলো আজও আমাদের সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক।’
আখড়াবাড়ির এক পাশে বসে কয়েকজন তরুণকে লালনের গান নিয়ে আলোচনা করতে দেখা গেল। তাদের হাতে মোবাইল ফোন, কেউ গানের কথা খুঁজছেন, কেউ ভিডিও করছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে লালনকে ঘিরে আগ্রহ দেখে আশাবাদী জহির উদ্দিন আসকারী। তিনি বলেন, ‘লালনের দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে শুধু অনুষ্ঠান করলেই হবে না। তার গান ও চিন্তাকে সহজভাবে তরুণদের কাছে তুলে ধরতে হবে।’
লালনের গানে যে জাত-ভেদাভেদহীন সমাজের স্বপ্ন রয়েছে, সেটিও দর্শনার্থীদের আলোচনায় বারবার উঠে আসে। তাদের মতে, সমাজে মানুষে মানুষে বিভাজন যতদিন থাকবে, ততদিন লালনের গান মানুষের কাছে ফিরে আসবে। কারণ সাঁইজীর তোলা প্রশ্নগুলো কেবল নিজ সময়ের ছিল না; আজকের সমাজের প্রশ্নও বটে।
পেশায় বাউল শিল্পী মাজেদা আখতার। বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়, সেখানে একটি আখড়ার সঙ্গে জড়িত তিনি। মাজেদা বলছিলেন, ‘আমরা অনেক সময় ধর্ম, বর্ণ, জাত কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করি। লালন সেই বিচারকে প্রশ্ন করেছেন। তার গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের বড় পরিচয় মানুষ হওয়া।’
মংমনসিংহ থেকে তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানে এসেছেন বাউল মধু শাহ। তার কাছে ছেঁউড়িয়ায় আসা এক ধরনের আত্মিক যাত্রা। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার এখানে এলে নতুন কিছু অনুভব করি। হাজার হাজার মানুষ একই জায়গায় এসে লালনের গান শুনছে, তার কথা বলছে। এই মিলনটাই লালনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বলে মনে হয়।’
এদিকে তিন দিনের আয়োজন ঘিরে ছেঁউড়িয়ায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। আখড়াবাড়ির আশপাশে বসেছে নানা ধরনের দোকান। কোথাও গান, কোথাও আলোচনা। সব জায়গায় দর্শনার্থীর ভিড়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাবুক-সাধক, বাউলদের গানের আসরও জমে ওঠে। একতারা, দোতারা আর কণ্ঠের সুরে তখন যেন হারিয়ে যায় স্থান-কাল।
লালনের তিরোধান দিবসকে ঘিরে আসা মানুষের কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট— তারা শুধু একজন সাধককে স্মরণ করতে আসেননি; তারা খুঁজতে এসেছেন মানুষে মানুষে মিলনের একটি দর্শন। জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে আহ্বান লালন রেখে গেছেন, সেটিই আজও তাদের আকর্ষণ করে।
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে তাই তিন দিনের এই আয়োজন শেষ হলেও লালনের গান থামে না। একতারা হাতে কেউ হয়তো আবার গেয়ে ওঠেন—মানুষের পরিচয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খোঁজার সেই পুরনো প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের টানেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বারবার ফিরে আসে লালনের কাছে।