জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে লঞ্চের পর এবার সারা দেশের স্পিডবোটের যাত্রী ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে শান্ত-অশান্ত দুই ধরনের নৌ-রুটে কিলোমিটার ও রুটভিত্তিক নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পিডবোটের ভাড়া বেড়েছে ৯ শতাংশ এবং অন্য নৌযানগুলোর যাত্রী ভাড়া বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ। স্পিডবোটের ক্ষেত্রে ৩৫টি শান্ত ও নয়টি অশান্ত রুটের নতুন ভাড়ার হার ওইদিন রাত ১২টা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
নতুন ভাড়ায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচটি অশান্ত রুটে আগের তুলনায় ৯ দশমিক ২৩ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে। এর মধ্যে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সঙ্গে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে আগের ২৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২৮৫ টাকা, কক্সবাজার ৬ নম্বর ঘাট মহেশখালীতে স্পিডবোট ভাড়া ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা ও বয়ারচর (চেয়ারম্যানঘাট)-নলছিরায় ৩২৫ থেকে বাড়িয়ে ৩৫৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া মগনামা-বড়ঘোপ ও মগনামা-দরবারহাট রুটের ভাড়া ৮৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫ টাকা। এ হিসাবে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সংযোগ নৌ-রুটের চেয়ারম্যানঘাট-নলছিরায় সর্বোচ্চ ৩০ টাকা ভাড়া বেড়েছে। তবে শতাংশের হিসাবে মগনামার দুই রুটে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে ভাড়া বেড়েছে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের টিএ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ছন্দা পাল স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিআইডব্লিউটিএর নৌ-রুট, পারমিট, সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধি ২৭ মোতাবেক সরকার কর্তৃক নৌযানে যাত্রী পরিবহনের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটার জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া ২ দশমিক ৯৫ থেকে শূন্য দশমিক ২২ টাকা বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১৭ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ভাড়া ২ দশমিক ৫২ থেকে শূন্য দশমিক ১৯ টাকা বাড়িয়ে ২ দশমিক ৭১ টাকা এবং জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়।
এদিকে স্পিডবোটের ভাড়ার ক্ষেত্রেও কিলোমিটারপ্রতি নতুন হার নির্ধারণ করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শান্ত নৌপথে প্রথম ১০ কিলোমিটারের প্রতি কিলোমিটারে ১৬ দশমিক ৩৫ টাকা, পরবর্তী ১০ কিলোমিটারে ১১ দশমিক ৭৭ ও অবশিষ্ট দূরত্বে ৯ দশমিক ৪২ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অশান্ত নৌপথে প্রথম ১০ কিলোমিটারে প্রতি কিলোমিটারে ১৮ দশমিক ৫৩ ও পরবর্তী দূরত্বে ১৬ দশমিক ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের পাশাপাশি স্পিডবোটের ভাড়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ঘাট-পয়েন্ট থেকে ইজারাদার ও নৌযান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে এ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যাত্রী ও নৌযান মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।’ নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ায় স্পিডবোট চলাচলের ক্ষেত্রে ভাড়া-সংক্রান্ত সংকট কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অশান্ত রুটগুলোর স্পিডবোট মালিকরা নতুন ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় নৌরুটে স্পিডবোট মালিকরা ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি—অশান্ত রুটগুলোর স্পিডবোট পরিচালনায় তুলনামূলক বাড়তি অকটেন, লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া উপকূলীয় রুটের স্পিডবোটগুলো ডাবল ইঞ্জিনে চলাচল করায় পরিবহন খরচও বেশি। ফলে শান্ত রুটের স্পিডবোটের মতো অশান্ত রুটের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করায় নৌপথের যাত্রী পরিবহনে বৈষম্য তৈরি হবে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটের স্পিডবোট পরিচালনাকারী ইজারাদার জগলুল হোসেন নয়ন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশের মতোই উপকূলীয় নৌ-রুটের স্পিডবোট ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি লুব্রিক্যান্টসহ সব স্পেয়ার পার্টসের দামও ঊর্ধ্বমুখী। নতুন এ ভাড়ায় উপকূলীয় রুটের স্পিডবোট পরিচালনা করলে লোকসানে সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আমরা এরই মধ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বর্ধিত ভাড়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে রেখেছি। অশান্ত নৌ-রুটের ক্ষেত্রে ভাড়া পুনর্বিবেচনা না করলে সার্ভিস পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে।’
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ মে শান্ত ও অশান্ত রুটের জন্য কিলোমিটার ও রুটভিত্তিক ভাড়া বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করেছিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।