রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয়ার পর ভাঙা একটি কক্ষেই আবার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্য কক্ষগুলোও পরিষ্কার করার কাজ চলছে। তবে পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগার ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সবাইকে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেন্টারের একটি ভাঙা কক্ষে চেয়ার-টেবিল পেতে বসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। কক্ষটিতে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার রাখা হয়েছে। সেখানে টিকা নিতে আসা শিশু ও মায়েদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বিদ্যুতের সংযোগ না থাকায় তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আরো দেখা যায়, একদিকে স্বাস্থ্যকর্মীরা কাগজের মোটা পাতাকে হাতপাখা হিসেবে ব্যবহার করে কাজ করছেন, অন্যদিকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রিরা ফ্যান ও লাইটসহ বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়ার কাজ করছেন। একই সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে ভাঙা কংক্রিট, ইটের টুকরাসহ ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, একটি ভাঙা কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তবে এখনো স্বাভাবিকভাবে সেবা দেয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচকাজের কোনো ব্যবস্থা এখনো হয়নি। এখানে সেবা নিতে মা ও শিশুরা আসেন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশির ভাগই নারী। তাদের সেবা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
এর আগে গত শনিবার সেন্টারের সামনে সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের টিকা দেয়া হয়। ভাঙা স্থাপনার কারণে সেন্টারের ফটকের বাইরে টেবিল-চেয়ার পেতে স্বাস্থ্যকর্মীরা এ কার্যক্রম চালান। গতকাল রোববারও একইভাবে সড়কের পাশে ত্রিপলের নিচে সেবা দেয়া হয় বলে জানান তিনি।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের সমন্বয়ক (প্রশিক্ষণ ও গবেষণা) ডা. রেজওয়ানা জাহান বলেন, গত দুই দিন সেন্টারের ভেতরে প্রবেশ করতেই পারেননি তারা। বাইরে টানিয়ে সীমিত পরিসরে সেবা দিতে হয়েছে। ইপিআইয়ের টিকা কোল্ড চেইন বজায় রেখে দিতে হয় বলে বাইরে থেকে এ কার্যক্রম চালানোও ছিল চ্যালেঞ্জের।
তিনি আরো বলেন, গত দুই দিনের তুলনায় আজ কিছুটা স্বস্তি মিলেছে, কারণ অন্তত কেন্দ্রের ভেতরে বসে সেবা দেয়া যাচ্ছে। বর্তমানে হামের ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন ও ইপিআইয়ের নির্ধারিত টিকা দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা সীমিত পরিসরে মা ও শিশুর সেবা দিচ্ছেন। তবে পানি, বিদ্যুৎ ও খাবারের সংকটে সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে।
গর্ভবতী ও নতুন মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের গোপনীয়তা প্রয়োজন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হচ্ছে বলে জানান ডা. রেজওয়ানা জাহান। গণমাধ্যম ও সরকারের সহযোগিতা পেলে দ্রুত সব ধরনের সেবা চালু করা সম্ভব হবে বলেও আশা করেন তিনি।
সেন্টারের প্যারামেডিক দোলন বলেন, গত সপ্তাহেও তারা ক্লিনিকে পূর্ণাঙ্গ সেবা দিয়েছেন। কিন্তু ভাঙচুরের পর এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। সেন্টারের বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে শিশু ও তাদের মা-বাবাকে। অনেকে কষ্টের কারণে ফিরে যাচ্ছেন। আগে প্রতিদিন শতাধিক শিশুকে টিকা দেয়া হলেও এখন ৫০টির বেশি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, শিশুদের টিকাদানের তথ্য যে খাতাগুলোতে সংরক্ষণ করা হতো, সেগুলোও চুরি হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জায়গার অভাবে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাও দেয়া যাচ্ছে না। আগের মতো পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করে মা ও শিশুদের ভোগান্তি কমানোর দাবি তাদের।
সেন্টারের অন্যান্য সেবাকর্মী ও নার্সরা জানান, খাবার পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগার না থাকায় তাদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের শৌচকাজের জন্য অন্যত্র যেতে হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০০ থেকে ২৫০ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভাঙচুর করেন। এ সময় সেখানকার দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়।
এক্সক্যাভেটর দিয়ে সেন্টারের একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ স্থাপনাগুলো ভেঙে দেয়া হয়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয়া হয়।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরো ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুসেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৪ সালে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।