মেট্রোরেলের উড়ালপথের পিলার, গার্ডার ও বেয়ারিংয়ের কাঠামোগত ত্রুটি আগেভাগে শনাক্ত করতে স্থায়ী সেন্সর স্থাপন এবং ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কম্পন, স্থানচ্যুতি ও কাঠামোগত পরিবর্তন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ড্রোনে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দৃশ্যমান ত্রুটি শনাক্ত করা হবে। মেট্রোরেলের বেয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে প্রাণহানি এবং পরবর্তী নিরাপত্তা নিরীক্ষায় ব্যাপক ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রস্তাব সামনে এসেছে।
ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বোর্ড রুমে গত ১৪ অক্টোবর এ বিষয়ে কারিগরি উপস্থাপনা দেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম। হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক তিনি। ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং নিরীক্ষা কমিটির দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সমন্বিত কাঠামোগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে এ উপস্থাপনা করা হয়।
এর আগে গত বছরের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড খুলে নিচের সড়কে পড়ে পথচারী আবুল কালাম আজাদ নিহত হন। তারও আগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একই এলাকার ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে বেয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় প্রাণহানি না হলেও প্রায় ১১ ঘণ্টা মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। পরপর এ ধরনের ঘটনায় মেট্রোরেলের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
গত জুলাইয়ে প্রকাশিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও মেট্রোরেলের অবকাঠামোর বিভিন্ন ত্রুটি উঠে আসে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের কমিটির নিরীক্ষায় ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি শনাক্ত হয়। বিভিন্ন পিয়ারের মাথা ও কংক্রিটের ভিত্তিতে ফাটল, রেললাইনের যন্ত্রাংশে মরিচা, ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত কম্পন ও ঝাঁকুনি এবং ওভারহেড বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্ফুলিঙ্গ তৈরির সমস্যাও চিহ্নিত করে কমিটি। এসব ত্রুটি নিরসনে কাঠামোগত মেরামত, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, কম্পন পরীক্ষা এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় সংসদে গত ৯ সেপ্টেম্বর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৭টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এসব প্যাড ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ডিএমটিসিএল। এছাড়া মেট্রোরেলের রুটে ৪৬টি পিয়ারে বিভিন্ন মাত্রার ফাটল শনাক্ত হওয়ার তথ্যও জানানো হয়। বেয়ারিং প্যাডের অবস্থান পরিবর্তন এবং কাঠামোগত ফাটলের বিস্তার পর্যবেক্ষণে মার্কার ও ক্র্যাক গেজ স্থাপনের কাজও চলছিল।
প্রস্তাবিত সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় উড়ালপথের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোয় স্থায়ী সেন্সর স্থাপন করে কম্পন, স্থানচ্যুতি ও অন্যান্য ভৌত পরিবর্তনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে বিশ্লেষণ করে কাঠামোর স্বাভাবিক আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সতর্কবার্তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কোনো কাঠামোয় ত্রুটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছার আগেই তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ড্রোনের সাহায্যে উড়ালপথের উঁচু ও দুর্গম অংশের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে কংক্রিটের ফাটল, পৃষ্ঠের ক্ষয় এবং কাঠামোর দৃশ্যমান পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেসব অংশ নিয়মিত পরিদর্শন করা কঠিন সেসব স্থানে এ প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ত্রুটি শনাক্ত ও ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা প্রকৌশল পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নও প্রয়োজন হবে।
ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবরের উপস্থাপনায় প্রস্তাবিত ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, কার্যপরিধি নির্ধারণ, চুক্তির শর্তাবলি, ব্যয় প্রাক্কলন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির কারিগরি বিবরণ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সভায় নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।