মিশন শেষে আইএমএফের বিবৃতি

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে দিতে পারে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ধীরগতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করতে দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপ না নিলে মাঝারি মেয়াদে এ প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৩ শতাংশের নিচে চলে যেতে পারে।

নতুন একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ঋণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২-১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল। সফর শেষে গতকাল সংস্থার মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার এক বিবৃতিতে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। সফরকালে প্রতিনিধি দলটি সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেন।

আইএমএফের বিবৃতিতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের সীমিত রাজস্বের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বাহ্যিক ঋণ ও চলতি হিসাবের ওপর চাপ তৈরি হলেও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় তা কিছুটা সামাল দেয়া যাচ্ছে। তবে দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক চাপ এখনো অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

সংস্থার মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার জানান, ২০২৫ সালের আর্টিকেল ফোর কনসালটেশনে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এবারের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় বাড়াতে হলে সরকারকে অবিলম্বে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কর সংস্কারের ফলে সাধারণ ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা সুনির্দিষ্ট সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্ব নীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে চালু হওয়া ক্রলিং পেগ বিনিময় হার পদ্ধতিটি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে নমনীয়তা আনবে এবং বাহ্যিক খাতের স্থায়িত্ব রক্ষা করবে।

ব্যাংক খাতের কাঠামোগত রূপান্তরের বিষয়ে আইএমএফ জোর দিয়ে বলেছে, একটি নির্ভরযোগ্য ও ব্যাপকভিত্তিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে এ খাতের সংস্কার করা উচিত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পুরো ব্যাংক খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিষ্কার বা ঝুঁকিমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

আইএমএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য আকার, শর্ত ও এর সঙ্গে যুক্ত সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

গতকাল মিশনের শেষ দিনে আইএমএফের প্রতিনিধি দল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফের নতুন কর্মসূচির ভিত্তিটা কী হবে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান রেখে এবং যখন যেটা প্রয়োজন সেভাবে পরিবর্তন করাটাই হবে এ কর্মসূচির ভিত্তি। এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে, বাকি পরিবর্তনগুলোও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে করা হবে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে। পরে অতিরিক্ত অর্থায়ন যুক্ত হওয়ায় কর্মসূচির আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৩ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় শর্ত বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে স্থগিত থাকে। পরবর্তী সময়ে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের সরকারের সময়ে নেয়া আইএমএফের কর্মসূচিতে অগ্রহণযোগ্য শর্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে এখান থেকে সরে আসার কথা জানায়। সেই সঙ্গে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু। গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন তিন বছরের কর্মসূচির জন্য চিঠি দেন। এবারের মিশন শেষে প্রতিনিধি দল আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের কাছে একটি প্রতিবেদন দেবে। এরপর আগামী অক্টোবরের বার্ষিক সভার সময় এ বিষয়ে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা হবে। পরবর্তী সময়ে আইএমএফের আরেকটি মিশন বাংলাদেশ সফর করতে পারে। সেই মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচি আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

আরও