গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের অন্তত দুই হাজার নেতা। তাদের মধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন ১ হাজার ৩০০-এরও অধিক। অর্থাৎ বিদেশ পালানো কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের দুই-তৃতীয়াংশের অবস্থান ভারতে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, গত আগস্টে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের দলীয় কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। পলাতকদের একটা বড় অংশের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। সম্প্রতি বিদেশে অবস্থানরত দলীয় নেতাদের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছে দলটি। তালিকা অনুযায়ী, সরকার পতনের পর প্রায় দুই হাজার দলীয় পদধারী নেতা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার তিন শতাধিক নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের বড় অংশই অবস্থান করছেন পশ্চিমবঙ্গে।
বিদেশে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি দুই হাজারের বেশি নেতা বিদেশে অবস্থান করছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, গুগল মিটের মাধ্যমে করা বিভিন্ন অনলাইনের বৈঠকে আমরা এ সংখ্যা ধারণা করছি। কিন্তু বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। তারা তো কেউ ইচ্ছা করে দেশ ছাড়েননি, পরিস্থিতির শিকার হয়েই দেশ ছেড়েছেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের কলকাতা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করলেও দলের অধিকাংশ নেতা কলকাতায়। দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা কলকাতার অভিজাত এলাকাখ্যাত নিউটাউন ও সল্টলেক এলাকায় অবস্থান করছেন। আর মধ্য ও নিচের সারির নেতারা অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকায় থাকছেন।
দক্ষিণ কলকাতায় যেসব জায়গায় স্বল্প মূল্যে বাসাবাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় তাদের মধ্যে অন্যতম গড়িয়া। কবি নজরুল ইসলাম মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন গড়িয়া বাজারে ভাড়া বাসায় থাকেন খুলনার এক উপজেলার নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাই পথে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি। প্রায় এক বছর ধরে সেখানেই অবস্থান করছেন। নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে গড়িয়া এলাকায় থাকছি। শীর্ষ নেতারা যেসব জায়গায় থাকেন সেখানে থাকার খরচ বহন করার সক্ষমতা আমাদের নেই। এমনকি পার্টির পক্ষ থেকে উল্লেখ করার মতো কোনো সহযোগিতাও করা হয় না। আমাদের মতো প্রায় ২৫-৩০ জন ছাত্রলীগের নেতা এ এলাকায় আছেন।’
শুধু ভারতে নয়, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে বহু আওয়ামী লীগ নেতা অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে সন্তানের কাছে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক এক মন্ত্রী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যারা মাঠের রাজনীতি করে উঠে এসেছি তাদের জন্য বিদেশে অবস্থান খুবই কষ্টসাধ্য। এ পরিবেশের সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত নই।’ তিনি আরো বলেন, ‘লন্ডনে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। ফলে কোনোভাবে দিন কেটে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি নিয়মিতই ভার্চুয়ালি মিটিংয়ের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখছেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন প্ররোচনায় যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল তারা ভুল বুঝতে শুরু করেছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘সারা দেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমর্থকদের ওপর হামলা, মামলা, লুটপাট করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে আমাদের নিরাপদ আশ্রয় বেছে নিতে হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, আমাদের বাড়িঘর লুটপাট ও ধ্বংস করা হচ্ছে সেটা দেশবাসী দেখেছে। নিরাপত্তা সংকটের কারণেই নেতাকর্মীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নয়, পুরো দেশই নিরাপত্তা সংকটে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই।’