কুষ্টিয়ার সাবেক দুই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দুদকের

দুদকের নথি অনুযায়ী, দুই সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে ২০২৬ সালের ২৪ মে পৃথক প্রতিবেদন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে ৮ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয়া হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, তদন্তে অন্য কোনো সম্পদের তথ্য বা অন্য কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কুষ্টিয়ার দুই সাবেক সংসদ সদস্য কামারুল আরেফিন ও সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৪৮৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি তাদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ২ কোটি ৩২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৯ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে দুজনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদকের প্রধান কার্যালয়।

দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের এজাহার অনুযায়ী, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৯ লাখ ১ হাজার ৪৮৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৮০১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছে দুদক।

গত ৮ অক্টোবর দুজনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয়া হয়। বর্তমানে সেলিম আলতাফ জর্জ কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাও রয়েছে। অন্যদিকে কামারুল আরেফিন পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুদকের এজাহার অনুযায়ী, কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, পশুর হাট ও বালুমহালের ইজারায় অনিয়ম, ঠিকাদারি কাজের নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হয়। তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। তবে এসব অভিযোগের সব কটির বিষয়ে এজাহারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।

কামারুল আরেফিন ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল দুদকে সম্পদ ও দায়-দেনার বিবরণী জমা দেন। এতে তিনি ৩ কোটি ১৯ লাখ ১৯২ টাকার স্থাবর ও ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখান। সব মিলিয়ে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৯৬ লাখ ৯৭ হাজার ২৫১ টাকা। পাশাপাশি ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণ বাবদ ২ কোটি ১৬ হাজার ৯৫৫ টাকার দায় দেখান তিনি।

দুদকের যাচাইয়ে তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার ১৮৪ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬৮ টাকা পাওয়া যায়। এতে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫২ টাকা। ঘোষিত সম্পদের তুলনায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৮০১ টাকার সম্পদ বেশি পাওয়া গেছে, যা গোপন করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ করবর্ষ পর্যন্ত কামারুল আরেফিনের গ্রহণযোগ্য আয় ছিল ৮ কোটি ২৫ লাখ ৮ হাজার ৩৫২ টাকা। একই সময়ে পারিবারিক ব্যয়, কর পরিশোধ, অন্যান্য ব্যয় ও স্ত্রীকে দান বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৩ হাজার ৭৮৪ টাকা। অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদের সঙ্গে এসব ব্যয় যোগ করে মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৮৩৬ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৮ কোটি ৯ লাখ ১ হাজার ৪৮৪ টাকা বেশি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর সম্পদ ও দায়-দেনার বিবরণী জমা দেন। এতে তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৬৩৫ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৯৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৭ টাকা। সে হিসাবে ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ৩৩ হাজার ৮০২ টাকা।

দুদকের যাচাইয়ে তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৬৪৫ টাকা। এতে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৮২ হাজার ২৮০ টাকা। ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এর পার্থক্য ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকা।

দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত সেলিম আলতাফ জর্জের গ্রহণযোগ্য আয় ছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪১ টাকা। একই সময়ে পারিবারিক ব্যয়, কর পরিশোধ ও অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৪ টাকা। তার মোট সম্পদের সঙ্গে এসব ব্যয় যোগ করলে সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯ হাজার ৬৪৪ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় এ পরিমাণ ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকা বেশি।

দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, সেলিম আলতাফ জর্জ ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব বিবরণী জমা দেন। পরে তা যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। টিমের নেতৃত্বে ছিলেন দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী; সদস্য ছিলেন সহকারী পরিচালক মো. বুলবুল আহমেদ।

দুদকের নথি অনুযায়ী, দুই সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে ২০২৬ সালের ২৪ মে পৃথক প্রতিবেদন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে ৮ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয়া হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, তদন্তে অন্য কোনো সম্পদের তথ্য বা অন্য কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও