মেঘনায় অবৈধ বালি উত্তোলন, তিতাস ভরাট করে ব্যবসা

হুমকির মুখে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলসেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেঘনা নদী থেকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালি তোলায় হুমকির মুখে পড়েছে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিড লাইন, গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় স্থাপনা।

একই সঙ্গে নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে পাড়ের হাজারো মানুষ। অন্যদিকে সরাইলে তিতাস নদীর একাংশ ভরাট করে বালি মজুদ করার অভিযোগ রয়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী আন্দোলনে নামলেও দ্রুত যৌথ অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

আশুগঞ্জ উপজেলার চর সোনারামপুর ও সোহাগপুর এলাকায় মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকার একটি প্রভাবশালী ইজারাদার মহল প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এ অপকর্ম চালাচ্ছে। অর্ধশতাধিক ড্রেজার ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার বালি তুলে নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিলীন হচ্ছে একসময়ের উর্বর কৃষিজমি। নদীতে বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে এলাকার হাজারো মানুষের বসতভিটা। মেঘনার চর সোনারামপুর ও সোহাগপুর এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। বাসস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদ, মন্দির, মাজারসহ বহু সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এখন ভাঙনের মুখে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ২৩২ কেভি জাতীয় গ্রিড লাইন, আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দুটি রেলসেতু ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর আগেও স্থানীয় প্রশাসন অবৈধ ড্রেজার বন্ধের মৌখিক আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এদিকে দেশে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নদী ও খাল খনন কার্যক্রম জোরদার করেছে সরকার। ঠিক সে সময়ই সরাইল উপজেলার পাকশিমুল এলাকায় বালি ফেলে তিতাস নদীর একটি অংশ ভরাট করে রেখেছে একটি শক্তিশালী মহল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ ও লাল নিশানা দেয়া হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। বিস্ময়কর বিষয় হলো বালি ভরাটের স্থানটি পাকশিমুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ঠিক পাশেই। নদীর বিশাল অংশে বালি ফেলে রাখায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নদীর তীর ভাঙনের আশঙ্কাও বাড়ছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সরাইল থেকে অরুয়াইল যাওয়ার পথে অরুয়াইল সেতুর পাশের দুটি স্থানে নদীর বড় অংশজুড়ে বালি ফেলে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে এখানে বালি মজুদ ও বিক্রির পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট করে দখলে রেখেছে। তারা দ্রুত বালি অপসারণ ও নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন।

পাকশিমুল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কুমুদ লাল দেবনাথ জানান, বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় নদীর সীমানায় লাল নিশানা টাঙানো হয়েছে। বালি সরিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত বালির মালিক আকবর আলী মুঠোফোনে জানান, জায়গাটি তিনি ভাড়া নিয়েছেন এবং মালিকানার সীমানার মধ্যেই বালি রেখেছেন। তবে বালি যদি কোনোভাবে নদীর অংশে গিয়ে থাকে, তবে তা সরিয়ে নেবেন। নদীর বিভিন্ন অংশ আগেই দখল হয়েছে, তিনি নদী দখল করেননি।

নদী রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা অবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার বন্ধ ও নদী দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে রাজপথে নেমেছেন। সম্প্রতি এসবের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই উদ্বেগজনক।’ তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নজরে বিষয়টি আনবেন ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদ্যোগ নেবেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবু সাইদ বলেন, ‘অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাটসহ হুমকিতে থাকা আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলসেতু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

আরও