অপরিকল্পিত পাইপলাইন, বিদ্যুৎ ঘাটতি

চৌমুহনী পৌরসভায় প্রকট হচ্ছে পানির সংকট

দীর্ঘদিন ধরেই পানির সংকটে ভুগছেন নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌরসভার বাসিন্দারা। নির্দিষ্ট সময়ে বিল পরিশোধ করলেও চাহিদা অনুযায়ী পানি পাচ্ছেন না।

দীর্ঘদিন ধরেই পানির সংকটে ভুগছেন নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌরসভার বাসিন্দারা। নির্দিষ্ট সময়ে বিল পরিশোধ করলেও চাহিদা অনুযায়ী পানি পাচ্ছেন না। অনেকে বৈদ্যুতিক মোটর স্থাপন করলেও তাতে পানি আসছে না। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে অবস্থা চললেও সমাধান করতে পারছে না পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বরং দিনদিন সংকট আরো প্রকট হচ্ছে। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানির স্তর নেমে যাওয়া বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সরবরাহে বেগ পেতে হচ্ছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অপরিকল্পিত পাইপলাইনের কারণে কোনো এলাকায় গ্রাহক পানি পাচ্ছেন, আবার কোনো স্থানে সংকট দেখা দিচ্ছে। পানি সরবরাহে পৌরসভার যেটুকু সামর্থ্য রয়েছে, সেটাও যথাযথ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

পৌরসভার নম্বর ওয়ার্ডের করিমপুরের লুতু মিয়ার বাড়ি বেশ পুরনো। বাড়িতে অন্তত ১৫০টি পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে পৌরসভার পানির লাইন কিন্তু ছয় মাসের বেশি সময় বাসিন্দারা পানি পাচ্ছেন না। গেল এক মাসে এক ফোঁটা পানিও ভাগ্যে জোটেনি তাদের। অনেকের পানির কল বিকল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির সামনের একটি মাত্র পুকুরই এখন তাদের ভরসা। আবার বেশি ব্যবহারের কারণে পুকুরের পানিও প্রায় দূষিত। এমন অবস্থা করিমপুরের আরো পাঁচ শতাধিক পরিবারের।

ওই বাড়ির বাসিন্দা রোকসানা বেগম বলেন, ‘প্রথম দিকে সরু পাইপলাইনে পানি কম আসছিল। পরে মোটা পাইপলাইন বসানো হয়েছে কিন্তু তাতেও পানি মিলছে না। ছয় মাসের বেশি সময় আমাদের এলাকায় পানির সমস্যা। গত চার মাসে তা আরো বেড়েছে। একটু পানিও মিলছে না। বাড়িতে একটি মাত্র পুকুর রয়েছে। যার পানি প্রায় ২০০টি পরিবার ব্যবহার করছে। সেখানকার পানিও দূষিত হয়েছে। এখন পুকুরের পানি ব্যবহার করলে এলার্জি দেখা দিচ্ছে।

শুধু করিমপুর নয়, পানি সংকটে রয়েছে পৌরসভার গণিপুর, পৌরহাজীপুর, আলীপুর, কিচমত করিমপুরসহ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার বাসিন্দা। এসব এলাকার বেশির ভাগ মানুষ কিনে পান করছে। বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করেও রিজার্ভ ট্যাংকি ভরা যায় না।

গণিপুরের বাসিন্দা রায়হান জানান, চার মাসের বেশি সময়  একটুও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে মোটর দিয়ে সামান্য পাওয়া গেলেও তা দিয়ে এক বেলার পানিও হয় না। বিষয়টি পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে অনেকবার বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। উল্টো মাসে মাসে পানির বিল গুনতে হচ্ছে। এভাবে চললে পানির জন্য হাহাকার দেখা দেবে।

পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখার তথ্য অনুযায়ী, পানির পাইপলাইন রয়েছে ১২৪ দশমিক কিলোমিটার। পানি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে ৫৮ লাখ ৯৫ হাজার লিটার। বিভিন্ন এলাকায় বসানো হয়েছে ১৫টি পাম্প। এসব পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলিত পানি নেয়া হয় কলেজ রোড, হাজীপুর চৌরাস্তা এলাকার তিনটি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে। সেখানে পানি পরিশোধন করে তা গ্রাহককে সরবরাহ করা হয়, কিন্তু প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়, তা দিয়ে হাজার ৮৩১ গ্রাহকের চাহিদার ৬৫ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হয়। তবে বাস্তবে ৬৫ শতাংশ পানি মিলছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকের।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অপরিকল্পিত পাইপলাইনের কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আবার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পানির মূল পাইপলাইনের সঙ্গে অবৈধভাবে তাদের মোটর সংযোগ দিয়ে সরাসরি পানি তুলে নিচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকের কাছে পানি পৌঁছাচ্ছে না।

পানি শাখার সহকারী প্রকৌশলী মিনহাজ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভূ-গর্ভের পানি উত্তোলনে গড়ে ৮০০-৯০০ ফুট গভীরে পাইপ বসানো হয়েছে। কিছুদিন পানি উত্তোলনের পর দেখা যায়, ওই স্তরে আর পানি নেই। সংকট দূর করতে হলে আরো পাম্প বসানো প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে ট্রিটমেন্ট প্লান্টও। তবে গ্রাহকের কাছ থেকে যে রাজস্ব আদায় হয়, তা দিয়ে নতুন প্লান্ট কিংবা লাইন কোনোটাই স্থাপন সম্ভব নয়। সরকারিভাবে বড় প্রকল্প নেয়া হলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।

পৌরসভার মেয়র খালেদ সাইফুল্যাহ পানির সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পানির স্তর নেমে গেছে। আবার বিদ্যুৎ সংকট তো রয়েছেই। আগে যেখানে ঘণ্টায় একটি ট্যাংকি ভরা যেত, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখন ১২ ঘণ্টায়ও ট্যাংকি ভরছে না। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রণালয়ে অনেকবার বলা হয়েছে। চাঁদপুরে একটা প্রকল্প রয়েছে, সেখান থেকে পানি সরবরাহের জন্যও বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা হয়নি। নতুন আরো পাম্প, ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রয়োজন। অনেক গ্রাহক আছেন, যারা ঠিকমতো পানির বিল দেন না। পৌরকর দেন না। পৌরসভার যে আয়, তা দিয়ে ঠিকমতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দেয়াও কষ্টকর। তবে পানির সমস্যা দূর করতে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সফল হলে সংকট দূর হবে।

আরও