যশোর কারাগারে মুক্তির অপেক্ষায় ৪৫ ভারতীয়

মিলছে না ভারতের অনুমোদন

বন্দিদের একজন চরল দেবী (৪৮)। দুই বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে তার চিকিৎসা চলছে।

বাংলাদেশের কারাগারে সাজা শেষ হলেও দেশে ফিরতে পারছেন না ৪৫ ভারতীয় নাগরিক। তাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ অনুমোদন দিয়েছে। তবে ভারতীয় হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পাওয়ায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিজীবন কাটছে তাদের। জানা গেছে, বন্দিদের মধ্যে সাতজন নারী। ৫০ বছরের বেশি বয়সী ২৪ জন। এরই মধ্যে অনেকেই শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

বন্দিদের একজন চরল দেবী (৪৮)। দুই বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে তার চিকিৎসা চলছে। চরল দেবীর মতোই দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন গোবিন্দ বিহারী (৪৭)। ২০১১ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের দায়ে এক বছরের কারাদণ্ড হয় তার। অনেক আগেই সাজা শেষ হয়েছে। এর পরও ১৪ বছর ধরে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের পর এসব ভারতীয় নাগরিক আটক হন। তাদের অধিকাংশেরই পাসপোর্ট নেই। তাদের কারো কারো কোনো সাজা হয়নি। বাকিদের ১৫ দিন থেকে দুই বছরের কম মেয়াদে সাজা হয়। সাজা শেষ হওয়ার পর তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতায় তা আটকে আছে।

কারা সূত্র জানায়, পাসপোর্ট না থাকায় এ বন্দিদের প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন নেয়া হয়। এরপর ভারতীয় হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুই দেশের সম্মতির পর প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু যশোরের বন্দিদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুমোদন মিললেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

কারা সূত্র জানায়, ভারতীয় বন্দিদের অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে থাকায় মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কেউ কেউ মানসিক রোগীদের মতো আচরণ করেন, এমনকি গায়ে কাপড়ও রাখতে চান না। এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকোথেরাপিস্ট ডা. এএইচএম মোস্তফা কামাল সৈকত বলেন, ‘দীর্ঘদিন কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া আটকে থাকলে হতাশা ও বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। তা তীব্র হলে মানসিক রোগেও রূপ নিতে পারে। তাই দ্রুত তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন।’

সূত্রটি আরো জানায়, ৪৫ বন্দির মধ্যে ২৪ জন পঞ্চাশোর্ধ্ব। ফলে তাদের শারীরিক রোগব্যাধি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিও। জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের থাকা-খাওয়ার যেমন ব্যয় আছে, তেমনি মারা গেলে মরদেহ সংরক্ষণেও ব্যয় হয়। বছরখানেক আগে এক ভারতীয় বন্দির মৃত্যুর পর মরদেহ সংরক্ষণে হাসপাতালের হিমঘর ভাড়া বাবদই প্রায় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ জানিয়েছেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পাওয়ায় বন্দিদের মুক্তি সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘মুক্তির অপেক্ষায় থাকা বন্দিদের তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। অধিকাংশই বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন পেয়েছেন।’

বন্দিদের দ্রুত ফেরাতে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসান। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় বন্দিদের দেশে ফেরাতে প্রশাসন কাজ করছে। হাইকমিশনের মাধ্যমে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তারা আশাবাদী। তা সম্ভব না হলে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্পও বিবেচনা করা হচ্ছে।’

আরও