চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে এ মহাসড়কে ৯১টি দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো কয়েকশ মানুষ। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অপর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ ও সড়কবাতি, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এবং ট্রাফিক আইন না মানাকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে নয়টি দুর্ঘটনায় ছয়জন, ফেব্রুয়ারিতে চারটিতে তিনজন, মার্চে ১৩টিতে ১২, এপ্রিলে ১৮টিতে ২১, মে মাসে ১৮টিতে ১৬, জুনে ১৬টিতে ১৩ ও জুলাইয়ে ১৩টি দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে এপ্রিলে। ওই মাসে ১৮টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়।
মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেট, চেরাগ আলী, সাইনবোর্ড ও বোর্ডবাজার এলাকায় দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি। এছাড়া গাছা, কলম্বিয়া, তেলীপাড়া, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, পোড়াবাড়ী, নগপাড়া ও সালনা এলাকাকেও দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জিএমপি।
এসব এলাকার বিভিন্ন কলকারখানা ও পোশাক কারখানায় কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে প্রতিদিন মহাসড়ক পার হতে হয়। বিশেষ করে কর্মঘণ্টা শুরুর আগে, দুপুরের বিরতি ও ছুটির সময়ে পথচারীর চাপ বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ বা ওভারপাস না থাকায় অনেকেই সরাসরি মহাসড়ক পার হন। যানবাহনের উচ্চ গতি ও অতিরিক্ত চাপের কারণে এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গত ৮ আগস্ট টঙ্গীর গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইয়াসিন নিহত হয়। এর আগে গত ৪ জুন গাজীপুর মহানগরের বাসন এলাকায় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় সুজন প্রামাণিক ও প্রদীপ চন্দ্র নিহত হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় বাসের ধাক্কায় আলমগীর নিহত ও সাহাবুল গুরুতর আহত হন।
জিএমপি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, চালকদের বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার, ফুটওভার ব্রিজ ও ফুটপাতের সংকট, উল্টো পথে অটোরিকশা চলাচল, যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা। কিছু স্থানে সড়কের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিআরটি প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিকেও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
তবে দুর্ঘটনার জন্য অপ্রতুল পারাপার ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবু তৈয়ব। তিনি বলেন, ‘মহাসড়কটি প্রশস্ত হলেও নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পথচারীদের জন্য ডিভাইডারে নিরাপদ জায়গা রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফুটওভার ব্রিজ ও ওভারপাস নির্মাণ করতে হবে।’
এরই মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ১০টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ। মূল্যায়ন শেষে ঠিকাদার নিয়োগ হলে নির্মাণকাজ শুরু হবে।
জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘মহাসড়কটি অনেক প্রশস্ত ও বিআরটির ছয় লেনের কারণে যানবাহনের গতি বেশি থাকে। পর্যাপ্ত আলো না থাকলে উচ্চগতির যানবাহনের চালকরা বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। চালকদের সচেতন করার পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’
তার মতে, মহাসড়কের মাঝখানে ফেন্সিং বা কার্যকর প্রতিবন্ধক স্থাপন করা দরকার, যাতে পথচারীরা ইচ্ছামতো এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে না পারে। তবে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের ঘাটতিও সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) গাজীপুরের সহকারী পরিচালক এসএম মাহফুজুর রহমান জানান, পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিবহন মালিক ও মালিক সমিতির নেতাদের বিভিন্ন নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, ডাম্পিং ও জরিমানার কার্যক্রমও চলছে।