চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মো. নাসির উদ্দিন। পরনে একটি লুঙ্গি, যা কাদা ও বালিতে ধূসর হয়ে গেছে। তার চোখেমুখে একরাশ শূন্যতা। সামনে ভিটেমাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ কঙ্কালসার কাঠামোটি একসময় তার বসতঘর ছিল। গত কয়েক দিনের ভয়াবহ বন্যায় সেটি এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাবা-মা বৃদ্ধ। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজ করে আমরা দুই ভাই সংসার চালাই। আমাদের মাটির ঘরে চারটি কক্ষ ছিল, কিন্তু বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। বোরোর ১৫০ মণ ধান ছিল, সেটাও নেই। রান্নাঘরে কাপড় টাঙিয়ে কোনো রকমে সাতজন থাকছি। সুপেয় পানি ও খাবারের সংকটে পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। হাতে টাকাও নেই যে আবার নতুন করে কিছু শুরু করব।’
মো. নাসির উদ্দিনের মতো একই হাহাকার এখন বাঁশখালীজুড়ে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার গুনাগরি, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, বৈলছড়িসহ উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর চিত্র নিমেষেই বদলে গেছে। স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়েছে বসতবাড়ি, ভেসে গেছে গৃহপালিত হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু। কৃষিজমি পরিণত হয়েছে বালুচরে। জেলায় প্রায় আট লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবারেরই এখন বসবাসের উপযোগী ঘর নেই। পানি নেমে গেলেও দুর্গত মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এ বন্যায় পুরো জেলায় ১৫ হাজার ২২৩টি বসতবাড়ি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাঁচা ও মাটির ঘরবাড়িগুলোর। পানি নামতে শুরু করায় দেখা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় আড়াই হাজার ও বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে বন্যায় ১৬ হাজার ২৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২২ কোটি ৫৫ লাখ ২৭ হাজার ৬০০ টাকায়। এর মধ্যে বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ—তিন উপজেলায়ই ক্ষতি হয়েছে ১১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বেশি।
এদিকে জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ১৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ, সাতকানিয়ায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ও চন্দনাইশে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এ তিন উপজেলায় মোট ক্ষতির পরিমাণ ১০৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।
প্রাণিসম্পদ খাতে চট্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে ক্ষতি হয়েছে ৪০ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে চট্টগ্রামে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৭ কোটি ৬১ লাখ ৮ হাজার ৭৪০ টাকায়। এর মধ্যে শুধু এ তিন উপজেলায়ই ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৬২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির উঠান ও ঘরের মেঝে কাদার স্তরে ঢেকে গেছে। মাটির তৈরি অনেক বাড়ির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও আবার পুরো ঘরই পানিতে বিলীন হয়েছে। অনেক বসতঘরের ভেতরে কাদার নিচে চাপা পড়ে আছে খাট, আলমারি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
বাঁশখালীর ৬ নম্বর কাথারিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইসমাইল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার পাঁচটি মাছের প্রকল্প ছিল। বন্যার কারণে সব মাছ ভেসে গেছে। প্রকল্পে থাকা কোরাল মাছগুলোর ওজন ছিল চার-পাঁচ কেজি। এনজিও থেকে ৫-৬ লাখ টাকা ঋণ নেয়ার পাশাপাশি আগের মাছ বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে এ প্রকল্পগুলো চালাচ্ছিলাম। এখন আমার সব শেষ। এনজিও ঋণের টাকা তো মাফ করবে না। নতুন করে আবার মাছের প্রকল্প শুরু করার পুঁজিও নেই।’
ভিটেমাটি হারানো সাতকানিয়ার গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘পানি নেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের শোবার বিছানাটাও কাদার নিচে। মাটির দেয়াল ধসে সব আসবাব চাপা পড়েছে। কয়েক দিন ধরে বাচ্চাদের নিয়ে অন্যের বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে আছি। রান্না করার মতো কোনো হাঁড়ি-পাতিলও অবশিষ্ট নেই। আমাদের এখন সাময়িক শুকনো খাবারের চেয়ে বেশি দরকার মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই। সবকিছু নতুন করে কিনে সংসার শুরু করব, সে পরিস্থিতিও আমার নেই।’
শুধু কৃষক বা মৎস্যচাষীই নন, প্রাণিসম্পদের ক্ষুদ্র খামারিরাও এ বন্যায় বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগিসহ মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৩টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। এতে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও আনোয়ারার পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারাই বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারানো খামারি মো. জাকারিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার কোয়েল পাখি ও বিদেশী মুরগির খামার ছিল। কোয়েলের বাচ্চাসহ সব নষ্ট হয়েছে। মুরগির ৮০ শতাংশ মারা গেছে। নিজের ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে খামার করেছিলাম। কিন্তু এখন আমার কিছুই নেই। এনজিও ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে। নিজের বাড়িও পানিতে ডুবে গেছে। আমি ও আমার পরিবার একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।’
বন্যায় সুপেয় পানির প্রায় ১৯ হাজার নলকূপ ও প্রায় ছয় হাজার টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দূষিত পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে স্থানীয় হাসপাতাল ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পগুলোয় প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের বন্যা ও পরবর্তী সময়ে দুর্গত মানুষের সহায়তায় কী কী করা যায়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রাথমিকভাবে চাল, ঢেউটিন ও শুকনো খাবার বরাদ্দের বিষয়ে কাজ চলছে। এছাড়া কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতিগ্রস্তদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সহায়তা এবং কী ধরনের প্রণোদনা দেবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে সমস্যাগুলো নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে।’