বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ

দেশে ভূমির অবক্ষয়ে কমছে উৎপাদনশীলতা

দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি হচ্ছে ভূমির অবক্ষয়। ফলে একদিকে যেমন কমে আসছে কৃষিজমির পরিমাণ, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। এতে কমছে কৃষি উৎপাদন।

ভূমির অবক্ষয় (ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন) বলতে মাটির স্বাস্থ্যহানিকে বোঝায়। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি বছর গড়ে ২৭ হাজার হেক্টর ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে। বেশ কয়েকটি কারণে ভূমির অবক্ষয় হলেও প্রধান কারণ মূলত পাঁচটি—মাটির রাসায়নিক গুণের অবনতি, ভূমিক্ষয়, পানির স্তর নেমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা ও মাটি জমাট বাঁধা ও অণুজীব হ্রাস।

সরকারের মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ভূমির অবক্ষয়ের ওপর সর্বশেষ ২০২০ সালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, দেশে ১ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর ভূমি অবক্ষয়ের শিকার। এটি দেশের মোট ভূমির ৭৬ দশমিক ১ শতাংশ। সংস্থাটি এ অবক্ষয়কে চারটি ভাগে ভাগ করেছে। অতিউচ্চ অবক্ষয়ের ফলে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। উচ্চ অবক্ষয়ে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ, মাঝারিতে ১০ থেকে ২৫ এবং সামান্যতে ১০ শতাংশের নিচে কমতে পারে কৃষি উৎপাদন। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ দেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভূমিতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা, মাটির পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন ইত্যাদি। এর মধ্যে লবণাক্ততা ও মাটির পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। লবণাক্ততা উপকূলবর্তী এলাকা ছাপিয়ে সমতলের জমিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এসআরডিআইয়ের সর্বশেষ (২০২৪) শুমারি অনুযায়ী, দেশের ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এসআরডিআইয়ের তথ্যানুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় ১৭ লাখ ৩ হাজার ৭৫৯ হেক্টর চাষযোগ্য জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৫৬ হাজার তথা ৬৮ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত।

মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নানা কারণে ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন হচ্ছে। লবণাক্ততা এবং পুষ্টিমান কমে যাওয়ার সমস্যা বেশি। পুষ্টির সমস্যাটি নানাভাবে সমাধান করা যায়। এর বাইরে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় ভূমিক্ষয় তুলনামূলক বেশি। ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন হলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়।’

কৃষির উন্নয়নে জমির ক্ষয় একটি পরিবেশগত বড় সমস্যা। প্রতিনিয়ত এ ক্ষয়ের পরিমাণ বাড়ছে। এর প্রধান কারণ টেকসই নয়, এমন কৃষি ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়ন।

ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পার্বত্য অঞ্চলে। ওই অঞ্চলের ৩৪.১% এলাকায় প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪০ টনের বেশি মাটিক্ষয় হয়। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বান্দরবান কার্যালয়ের হিসাবে ২০২৪ সালে এ হার ছিল প্রায় ৮৭ টন। তবে কম বৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির বছরগুলোতে ভূমিক্ষয়ের তারতম্য হয়। ২০২৪ সালে হেক্টরপ্রতি ৮৬ দশমিক ৬২ টন মাটিক্ষয় হয়েছে। ২০২৩ সালে যেটি ছিল ৪৮ দশমিক ৮৭ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হেক্টরপ্রতি মাটিক্ষয় বেড়েছে ৭৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০২২ সালে এর পরিমাণ ৩২ দশমিক ৫৫ টন। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে মাটিক্ষয় বেড়েছে ১৬৬ শতাংশ।

২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এবং চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের যৌথ উদ্যোগে ‘আরইউএসএলই মডেল ব্যবহার করে পাহাড়ি এলাকার মাটিক্ষয় মূল্যায়ন—পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি কেস স্টাডি’ শিরোনামে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণাটি ‘রিভাইস ইউনিভার্সাল সয়েল লস ইকুয়েশন মডেল’ (আরইউএসএলই) অনুযায়ী করা হয়। ওই গবেষণায় বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরে ১ লাখ ৮২ হাজার ৬২১ টন মাটি ক্ষয় হয়। হেক্টরপ্রতি যেটির গড় ১৫ দশমিক ১৮ টন।

ওই গবেষণা দলে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. এমএম আব্দুল্লাহ আল মামুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাটি ক্ষয়ের পেছনে মূলত চারটি কারণ রয়েছে। প্রথমত মাটির গঠন। পলি সঞ্চিত (সেডিমেনটরি ফরমেশন) মাটি হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে মাটির কণাগুলো আলাদা হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত হচ্ছে পাহাড়ের ওপরে আচ্ছাদন নষ্ট হওয়া। পাহাড় কাটা, পাহাড়ের ওপর গাছ, লতাপাতা ধ্বংস করার মাধ্যমে এ আচ্ছাদন নষ্ট হয়। ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে আঘাত করছে। ফলে মাটি ধুয়ে পানির সঙ্গে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, জুম চাষের সময় মানুষ বনে বা পাহাড়ে আগুন দিচ্ছে। এতেও পাহাড়ের আচ্ছাদন নষ্ট হচ্ছে। চতুর্থত, পার্বত্য অঞ্চলটি সমতল না, সেখানকার মাটি ঢালু (স্লোপ)। এতে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে নামার সময় মাটির ওপরের অংশ ধুয়ে নিয়ে যায়।’

মাটি ক্ষয়ের ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে ড. এমএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘একটি মাটি তৈরি হতে শত বছরও লেগে যায়। মাটি তৈরি হয় রক ও মিনারেল থেকে; যেটি মাটির নিচে থাকে। সেখান থেকে একটি মাটির কণা তৈরি হতে শত বছরও লেগে যেতে পারে। কিন্তু বৃষ্টির ফলে সেকেন্ডেই সেটি ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। এখন পাহাড়েও চাষ করার জন্য সার ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি হচ্ছে মূলত মাটিক্ষয়ের কারণে।’

আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। সেই সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫ একরের কম জমির মালিক প্রান্তিক চাষীর হার ৪১ শতাংশ। দেশে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এছাড়া বিদ্যমান প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। বিপরীতে পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে দেশে কৃষি উৎপাদন ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতসহ নানা কারণে বাড়ছে ফসলের ক্ষতি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন কমবে কৃষির।

গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে জানানো হয়, পরিবেশগত এ চ্যালেঞ্জের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে ধানের ফলন কমতে পারে ৪ শতাংশ। যেটি ২০৫০ সালে গিয়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ পৌঁছতে পারে। আর ২০৩০ সালে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কারণে ধানের ফলন কমবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে ২০৪০ সালে গমের ফলন কমতে পারে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০৫০ সালে এ খাদ্যশস্যের ফলন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে কমতে পারে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০৩০ সালে পাটের ফলন কমবে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০৪০ সালে যেটি কমবে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে কমার হার বেড়ে হবে ৩ শতাংশ।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে সবজি, ডাল ও তেলবীজ জাতীয় শস্যেরও। ২০৪০ সালের মধ্যে সবজির ফলন কমতে পারে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০৫০ সালে ফলন কমার হার বেড়ে হবে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০৩০ সালে কমার হার থাকবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০৪০ সালে ডালের ফলন কমবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০৫০ সালে এ হার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হবে। তেলবীজ জাতীয় শস্যের ফলন ২০৩০ সালে কমবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০৪০ সালে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে কমার হার হবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

দেশের কিছু এলাকায় নিয়মিতভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে।এসব ভূমির অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। পানির স্তর নেমে যাওয়া এলাকা সহজে খরার কবলে পড়ে। কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে খরাকে নীরব ঘাতক হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা। খরাপ্রবণ এলাকায় গ্রীষ্মকালে পানীয় জলের কমতি দেখা দেয়। এসব এলাকায় গবাদিপশু পালনও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নেচার সাময়িকীর সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে ‘ডিলাইনেটিং দ্য ড্রট ভালনারেবিলিটি জোনস ইন বাংলাদেশ’ও ২০২২ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাট অল’ শীর্ষক দুটি গবেষণার তথ্যানুসারে গত ৫৪ বছরে দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ ভূমি খরায় প্রভাবিত হয়েছে। এছাড়া ২২টি জেলা খরার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কৃষিবিজ্ঞানীরা উদ্বেগ জানিয়ে বলছেন, মাটি আগের মতো উর্বর নেই। দিন দিন এর অবক্ষয় বাড়ছে। এটি শুধু কৃষি উৎপাদন কমাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপও তৈরি করছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে তারা কম মুনাফা পাচ্ছেন। কৃষি খাতে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় কৃষক এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’

আরও