যশোরের বধ্যভূমিগুলো বেহাল দশায়: মুছে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন

কথিত আছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ তার থ্রি নট থ্রি বন্দুক দিয়ে বিমানবন্দরে অবতরণরত যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিলেন। সে গুলিতে বিমান বা বিমানের কোন আরোহীর কোনো ক্ষতি হয়নি। সে সময়ের ধোপাখোলার আরবপুর ইউনিয়নে ছিল শান্তি কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল সলেমান মুন্সীর বাড়ি। এ গুলির ঘটনার পর তার চেনানো পথে রাজাকারেরা আক্রমণ করে ধোপাখোলায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন বধ্যভূমিগুলো বেহাল অবস্থায় রয়েছে। অযত্ন আর অবহেলায় অনেক স্থানে হারিয়ে যেতে বসেছে পাক হানাদার আর রাজাকারদের নির্মমতার চিহ্ন। কোথাও কোথাও বধ্যভূমির ওপর বাড়িঘরও গড়ে উঠেছে। 'অথচ বাঙালির সবচেয়ে গৌরবময় রক্তাক্ত ইতিহাসেরমর্মন্তুদ স্মৃতিবিজড়িত অর্ধশতাধিক বধ্যভূমি রয়েছে প্রাচীনতম এ জেলায়।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য গৌরবময় ইতিহাসের পাদপীঠ প্রচীনতম জেলা যশোর। রক্তাক্ত রণাঙ্গনের নয় মাসের যুদ্ধ পেরিয়ে এই জেলা শত্রুমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। কিন্তু এর আগেই মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে গোটা যশোর জেলার উপর পাক হানাদার ও দোসররা চালিয়েছিল নির্মম তাণ্ডব। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীসহ নিরীহ শত শত মানুষকে ধরে এনে বধ্যভূমিগুলোতে হত্যা করা হয়েছিল।

শহরের অন্যতম বধ্যভূমি শংকরপুর রায়পাড়া এলাকায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখান থেকে কয়েক ট্রাক মানুষের হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার করে মিত্রবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়।এ বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলেও এটি অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে সারাবছর। প্রতিবছর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। কিন্তু বছরের অন্য সময়গুলোতে এ বধ্যভূমির আর কোনো খোঁজ নেয়া হয় না।

এটি ছাড়াও যশোর শহর ও শহরতলী এলাকায় অন্তত ৫০টি বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিরামপুর, ধোপাখোলা, খয়েরতলা, যশোর সেনানিবাস, হর্টিকালচার সেন্টার, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, কোতোয়ালি থানা চত্বর, বকচর, মুড়লি মোড়, ব্যাপ্টিস্ট চার্চ, রূপদিয়া, রূপদিয়া নীলকুঠি, রেলস্টেশন মাদরাসা, চৌগাছার ডাকবাংলো, কপালিয়া খেয়াঘাট, খাজুরা, বাঘারপাড়ার চিত্রা নদীর তীর, অভয়নগরের ভৈরব নদ তীর, কেশবপুরের মঙ্গলকোট ব্রিজ, সীমান্তের মাশিলা গ্রাম এবং শার্শা থানার বধ্যভূমি।

শংকরপুর রায়পাড়ায় ওই সময়ের প্রতক্ষ্যদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে এনে ছাড়াও ট্রেনে করে অসংখ্য মানুষকে রায়পাড়া বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা হতো। এরপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে এই বধ্যভূমিতে হত্যা করা হত। সেসময় ওই এলাকা বনজঙ্গল ঘেরা এবং নির্জন হওয়ায় অসংখ্য মানুষকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে।

সরকারি তথ্য বাতায়নে ধোপাখোলা বধ্যভূমির বর্ণনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলীর যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি চালানোর বীরত্বপূর্ণ ঘটনার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। কথিত আছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ তার থ্রি নট থ্রি বন্দুক দিয়ে বিমানবন্দরে অবতরণরত যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিলেন। সে গুলিতে বিমান বা বিমানের কোন আরোহীর কোনো ক্ষতি হয়নি। সে সময়ের ধোপাখোলার আরবপুর ইউনিয়নে ছিল শান্তি কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল সলেমান মুন্সীর বাড়ি। এ গুলির ঘটনার পর তার চেনানো পথে রাজাকারেরা আক্রমণ করে ধোপাখোলায়।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বিরামপুরেও বেশ কয়েকটি গণহত্যা চালানো হয়। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর বিরামপুরের একটি কুয়ার মধ্য থেকে ১০টি মানুষের মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। আর ভৈরব নদের দড়াটান ব্রিজের পাশেও ফেলা হয়েছে অনেক মুক্তিকামী মানুষের মৃতদেহ। বিভিন্ন স্থানে হত্যার শিকার এই মানুষগুলোর মরদেহ সুইপাররা এখানে এনে ফেলতো। ২০১০ সালেও যশোরের ঢাকা রোড বাবলাতলা ব্রিজ সংলগ্ন ভৈরব নদের তীর থেকে বেশ কিছু কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই ব্রিজের নিচেও অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে ফেলা হয়েছিল।

সূত্র জানায়, যশোর জেনারেল হাসপাতাল, বকচর, কোতোয়ালি থানা এবং রেলস্টেশন মাদরাসা এলাকার বধ্যভূমি সংরক্ষিত হলেও সেগুলো অযত্নে রয়েছে। অন্য বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে বাড়িঘর। মুক্তিযোদ্ধারা এবং নতুন প্রজন্ম প্রশাসন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির প্রতি এ স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লিবারেশন ফোর্স — মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের উপ-অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম বলেন, এ বধ্যভূমিগুলো বাঙালির সংগ্রামের চিহ্ন এবং পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের নির্মমতার সাক্ষী। 'এগুলো সংরক্ষণ করা না হলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে যাবে,' বলেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা।

আরও