মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় একে অন্যকে দুষছে বিএনপির দুই গ্রুপ

স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সভাপতি করে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে টিকা কেন্দ্রের খাস জমিটি বরাদ্দের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।

রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূল অপরাধীরা এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাতের ওই ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপির দুই গ্রুপ একে অন্যকে দুষছে। তবে পুলিশ বলছে, অপরাধী যে-ই হোক দল-মত নির্বিশেষে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির মূল ফটকের বাইরে অস্থায়ীভাবে টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। টেবিল-চেয়ার পেতে ত্রিপল টানিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাদানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বসেছেন। খোলা আকাশের নিচে ত্রিপলের ভেতরে প্রচণ্ড গরমে টিকাদানের জন্য আসা মা ও শিশুদের ভোগান্তিতে পড়তে দেখা যায়। কেন্দ্রে নিয়মিত ইপিআই টিকাদানের পাশাপাশি ‘হাম-রুবেলা ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন-২০২৬’ পরিচালিত হচ্ছিল। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসবোত্তর সেবা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টিসেবাসহ অন্যান্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হলেও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে টিকাদান বাদে সেসব সেবা সীমিত আকারে দেয়া হচ্ছে। অনেক রোগীকে শুধু প্রেসক্রাইব করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেবা চলাকালীন রাড্ডার মূল ফটকের সামনে ও গুঁড়িয়ে দেয়া ভবনের চারপাশে পুলিশি পাহারা দেখা গেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাড্ডা এমসিএইচ নামের বেসরকারি সংস্থাটি ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের কার্যালয় থেকে তাদের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পরে ১৯৯০ সালে মিরপুর ১ নম্বরে শাহ আলী থানা এলাকায় সীমিত পরিসরে রাড্ডার একটি টিকাদান কেন্দ্র চালু করা হয়। বস্তির ভেতরে কলার আড়তের সঙ্গে এক রুম নিয়ে টিকা কেন্দ্রটি যাত্রা শুরু করে। টিকাদানের কার্যক্রম চলত সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। পরে বিকাল থেকে সেখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কর্মীরা সময় কাটাতেন। জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং সবশেষে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ওই কলার আড়তের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবস্থান করতেন। এর মধ্যে ২০০২ সালের ১০ মে ধানমন্ডির অর্কিড প্লাজার সামনে গুলিতে নিহত হন মিরপুর থানার বিএনপি নেতা ও তৎকালীন ৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার সায়েদুর রহমান নিউটন। এরপর তার স্ত্রী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হন। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বর্তমানে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সভাপতি করে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে টিকা কেন্দ্রের খাস জমিটি বরাদ্দের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। সে সময় পূর্তমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। একই সময়ে ওই জায়গার জন্য আবেদন করেন বিএনপির মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি মশিউর রহমান মশুর স্ত্রী। তবে সে সময় ওই জমির পাশের খাস জমিটি মশিউর রহমানের নামে বরাদ্দ থাকায় একই পরিবারে দুটি জমি বরাদ্দ না দিয়ে জমিটি ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’কে বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর নামজারি করে টিকা কেন্দ্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখে জমির নিয়ন্ত্রণ নেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অনুসারীরা। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে টিকা কেন্দ্রের ভেতরের অংশটি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নিয়ন্ত্রণে নেন।

২০২৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জমিটির দখল বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’। কিন্তু রাড্ডা এওবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাধার মুখে জমির দখল নিতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে রাড্ডার জায়গার নিয়ন্ত্রণ নেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সেখানে হামলা চালায় দুই শতাধিক দুর্বৃত্ত। তিনটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি। জমির নিয়ন্ত্রণ নিতে সেখানে টানিয়ে দেয়া হয় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডে’র সাইনবোর্ড। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা হয় মো. হানিফ মিয়া নামের একজনসহ ২৫০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে।

বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মো. হানিফ মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার সায়েদুর রহমান নিউটন হত্যা মামলায় আমি ছিলাম সাক্ষী। আর আসামি ছিলেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মশিউর রহমান মশু। সে সময় থেকে আমার ওপর তাদের ক্ষোভ ছিল। সম্প্রতি মশুর ছোট ভাই সাজ্জাদুল মিরাজ ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব হন। আমি এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচন করার ঘোষণা দেয়ার পর থেকে তারা আমাকে ফাঁসাতে আরো বেশি সক্রিয় হয়। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই এ মামলায় আমার নাম দেয়া হয়েছে বলে ধারণা করছি। হামলার দিন আমি আমার মিরপুর-১ নম্বরের বাসায় ছিলাম। রাত ৩টার দিকে একটা ফোন কলের মাধ্যমে এ ঘটনা জানতে পারি। কিন্তু সেখানে আমি যাইনি। পরে সকালে গিয়ে দেখি ধ্বংসস্তূপ।’

তবে বিএনপির মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মো. হানিফ মিয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ। তিনি বলেন, ‘মো. হানিফ মিয়া স্থানীয় সকল সমবায় সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমনকি এ সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডেরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। যখন রাড্ডার কার্যালয়ে হামলা হয় তখন আমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শাহ আলী থানার ওসিকে ফোন দিই। এরপর মিরপুরের উপকমিশনারকেও (ডিসি) ফোন দেয়া হয়। পরে পুলিশ এসে ঘটনা তদন্ত করে যার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে, তারই নাম এজাহারে উল্লেখ করেছে। এখানে তাকে ফাঁসানোর জন্য মামলায় নাম দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

এ বিষয়ে কথা বলতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডে’-এর ব্যবস্থাপনা কমিটির ২০০৬ সালের নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ৫ নম্বরে রয়েছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম। আর ৭ নম্বরে রয়েছে মো. হানিফ মিয়ার নাম। সমিতির অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে মো. মিজানুর রহমান হাজরার। সমিতির মোট সদস্য সংখ্যা ৪৯।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে এ সেন্টারে যা ঘটেছে তা নিছক কোনো ডাকাতি বা হামলা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম। সন্ত্রাসীদের আক্রমণে সেন্টারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ২৫০ জনের অধিক একটি সন্ত্রাসী দল নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এ বর্বর হামলায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে সেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছি। আমরা দায়ীদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’

এদিকে গতকাল বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘রাত পৌনে ২টার দিকে ঘটনাটি ঘটে। খবর পাওয়ার পর পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল কিনা এবং কারো কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এজন্য দারুসসালাম অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনারকে (এডিসি) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনাটি আধা ঘণ্টা বা ১ ঘণ্টায় ঘটানো সম্ভব নয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মনে হয়েছে, এটি সময় নিয়ে করা হয়েছে। বিশেষ করে ভবনের দুই পাশের টিনশেড ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাংচুর করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন জায়গায়ও ভাংচুরের আলামত পাওয়া গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের ছাড় দেয়া হবে না। কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। যারা এসব করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া এজাহারে নাম উল্লেখ থাকা একজনসহ আরো ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

আরও