চার বিভাগে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণ

সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নিয়ে বিপাকে কারিগরি অধিদপ্তর

রাজধানীর বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, উচ্চতর প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে চার বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনে ২০১৮ সালে প্রকল্প নেয় সরকার।

প্রায় ১ হাজার ৬২১ কোটি টাকার প্রকল্পটি নয় বছরেও একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি। ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ না করায় প্রকল্পের জমি স্থানীয়রা ধান, খড় ও লাকড়ি শুকানোর কাজে ব্যবহার করছেন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই নেয়া প্রকল্পটি শুরু থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ, স্থান ও নকশা পরিবর্তনসহ নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় খুঁড়িয়ে চলছে। এত বছরে ১৩০টি প্যাকেজের মধ্যে দরপত্র হয়েছে মাত্র সাতটির। চার দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ। শুরু থেকে কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে চলমান প্রকল্পটি নিয়ে বিপাকে খোদ বাস্তবায়নকারী সংস্থা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরই।

চারটি কলেজের একটি খুলনা বিভাগের নড়াইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ২০১৮ সালে প্রায় ৩৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সরজমিনে দেখা গেছে, নড়াইল শহর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে আট একর জমিতে কলেজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে কয়েকজন শ্রমিক ১০ তলা প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ করছেন। ভবনটির ছয়তলার ছাদ নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং সাততলার ছাদের কাজ চলছে। তবে কলেজ এলাকার অধিকাংশ জমি এখনো ফাঁকা পড়ে আছে। মাটি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ না হওয়ায় স্থানীয়রা জমিটি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলীরা জানান, ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলাবিশিষ্ট কলেজের একটি প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ কাছ চলমান রয়েছে। এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের ছয় তলাবিশিষ্ট দুটি ভবনের নির্মাণকাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, দ্রুত ভবন দুটির কাজ শুরু হবে।

নড়াইল কলেজ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী অরুণাভ রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রশাসনিক ভবনটির কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আরো দুটি ভবনের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আছে, টেন্ডার হলে ভবন দুটির কাজ শুরু হবে। বাকি ভবনগুলো মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে এলে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে ‘চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করায় পরিকল্পনা কমিশন শুরুতেই আপত্তি জানিয়েছিল। তবে সেই আপত্তি উপেক্ষা করেই প্রকল্পটি অনুমোদন নেয় বাস্তবায়নকারী সংস্থা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি, খুলনার নড়াইল, রাজশাহীর নওগাঁ ও রংপুরের ঠাকুরগাঁও জেলাকে নির্বাচন করা হয়।

প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা। পরে কাজ শুরু না করেই দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৬২১ কোটি টাকা করা হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কলেজে ১০ তলা একটি প্রশাসনিক ভবন, তিনটি একাডেমিক ভবন এবং দুটি ছাত্রছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে প্রথম দরপত্রের মাধ্যমে শুধু প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করা হলেও প্রায় পাঁচ বছরেও কোনো ভবনের কাজ শেষ হয়নি।

এর মধ্যে নওগাঁর প্রশাসনিক ভবনের ৭৭ শতাংশ, ঠাকুরগাঁওয়ের ৫০ শতাংশ, নড়াইলের ৪৫ শতাংশ এবং খাগড়াছড়ির প্রশাসনিক ভবনের ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া সমন্বিত মাল্টিপারপাস ভবন, মসজিদ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডরমিটরি, সীমানাপ্রাচীর ও মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজ করার কথা থাকলেও প্রশাসনিক ভবন ছাড়া অন্য কোনো স্থাপনার কাজ শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এমনকি এসব স্থাপনার দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, রেট শিডিউল পরিবর্তন এবং নকশা প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি এখনো ২৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

সরকারের মূল্যায়নকারী সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আট বছর ধরে প্রকল্পটি প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় আটকে আছে। প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ হওয়ার অন্যতম কারণ ৬৫টি পূর্ত প্যাকেজের চারটি ও ৬৫টি পণ্য প্যাকেজের তিনটি প্যাকেজের টেন্ডার হয়েছে। বাকি প্যাকেজগুলোর টেন্ডার না হওয়ায় কোনো ভবনের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। প্রতি অর্থবছর সরকার অর্থ বরাদ্দ দিলেও নয় বছরে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মাত্র ৭ শতাংশ খরচ করতে পেরেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অর্থ ব্যয় করতে না পারাকে সংশ্লিষ্টরা সংস্থাটির বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি ও অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

প্রকল্পটির মাত্র একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানেও নির্মাণকাজে ত্রুটি পেয়েছে আইএমইডির পরিদর্শক দল। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নড়াইল ও ঠাকুরগাঁওয়ের প্রশাসনিক ভবনের বিম ও কলামে হানিকম্বজনিত ত্রুটি পাওয়া গেছে। এক ভবনে একাধিক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, ফলে তদারকি নেই। চারটি কলেজ এলাকায় নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নির্মাণসামগ্রী যাচাই করার কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।

এমন প্রকল্প নিয়ে বিপাকে পড়েছে স্বয়ং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো প্রকল্পের শুরুটা যখন অনিয়ম করে হয় তখন সেটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এ প্রকল্প নিয়ে বিপাকে আছে। কোনো কাজই ঠিকমতো হচ্ছে না।’

প্রকল্পটির ধীরগতির জন্য রেট শিডিউলের পরিবর্তন, বুয়েটের সার্ভিস পেতে দেরি হওয়াকে দায়ী করছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়সাল মুফতী। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটির অগ্রগতি এত কম হওয়ার প্রধান কারণ শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়া। এছাড়া ২০১৮ সালের রেট শিডিউলে প্রকল্পটি নেয়া হলেও ২০২২ সালে এসে সেটি পরিবর্তন হয়ে যায়। বুয়েটের যে সার্ভিস পাওয়ার কথা ছিল সেটি পেয়েছি দেরিতে। এরপর এখানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থাপত্য বিভাগকে কাজ দেয়া হয়েছে, সেখানেও দেরি হয়েছে। যে কারণে এখনো অনেক পিছিয়ে। আমরা প্রশাসনিক ভবনের কাজ শেষ করার পর্যায়ে আছি। আরো পাঁচটি করে ভবনের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান। সেগুলো শেষ করতে পারলে ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ অনেকটা শেষ করে ক্লাস শুরু করতে পারব। একাডেমিক ভবন ও প্রশাসনিক ভবনগুলো হয়ে গেলে প্রাথমিকভাবে ক্লাস শুরু করা যাবে। বাকি কাজ ধীরে ধীরে করা যাবে।’

প্রকল্পের শুরুতে সমীক্ষা না হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশীদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যখন কোনো প্রকল্প ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া নেয়া হবে তখন সেখানে শুরু থেকে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। কারণ প্রকল্প নিতে হলে আর্থিক বিশ্লেষণ, ব্যয়সীমা, খসড়া নকশার প্রয়োজন হয়। না হলে ইচ্ছামতো নকশা, মানহীন ভবন নির্মাণ ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ থাকে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও পিডিরা অনিয়ম করার সুযোগ পায়। এ প্রকল্পে এগুলোর প্রবল সম্ভাবনা আছে। আর রাষ্ট্র অর্থ বরাদ্দের পর সেটা খরচ করতে না পারা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। আর যা খরচ করেছে তা তো অপচয়।’ বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের দক্ষতার অভাবে যদি এমনটা ঘটে থাকে তাহলে পরিকল্পনার শুরু থেকে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন সাবেক এ আমলা।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নড়াইল প্রতিনিধি ইমরান হোসেন)

আরও