ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

উৎপাদনে নেই ৭২ শতাংশ কেন্দ্র, দূরের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে বাড়ছে ট্রান্সমিশন লস

বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বেশ কয়েকটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা গেলে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা মেটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কেন্দ্র থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে বিদ্যুৎ সঞ্চলন করে ঢাকাসহ আশপাশ এলাকায় সরবরাহ করতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। এতে সঞ্চালন লোকসান বাড়ার পাশাপাশি ভোল্টেজের ওঠানামা, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও বিদ্যুতের গুণগত মানেও প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ পরিবহনের কারণে গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির একাধিক বৈঠকেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য বলছে, গত কয়েক অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সিস্টেম লস তুলনামূলক কম থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সঞ্চালন ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাবের সঙ্গে দেয়া এক চিঠিতে পাওয়ার গ্রিড জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিস্টেম লস ছিল ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পরিবহন বেড়ে যাওয়া সঞ্চালন লোকসান বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর এলাকায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন ২১টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। পেট্রোবাংলার ১৩ সেপ্টেম্বরের গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি ১৫টি কেন্দ্র জ্বালানি পাচ্ছে না। অর্থাৎ এ অঞ্চলের প্রায় ৭২ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বন্ধ রয়েছে।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। এর মধ্যে তিতাসের আওতাধীন কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৬ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র ঢাকা, গাজীপুর, আশুলিয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে গ্যাস পাওয়া ছয়টি কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বেশ কয়েকটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা গেলে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে কেন্দ্রগুলো নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো কেন্দ্র ১০ দিন চালানোর পর ২০ দিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার কোনো কেন্দ্র মাসের পর মাসও বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নরসিংদীর ঘোড়াশালে ১ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। গ্যাস না পাওয়ায় কেন্দ্রটির বিপুল সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ বিপুল জনবল ও অবকাঠামোগত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বিপিডিবিকে।

নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটেও একই চিত্র। ৫৮৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার সামিট মেঘনাঘাট-২ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাস সংকটে উৎপাদনে নেই। একই এলাকায় ৭১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার জেরা মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া হরিপুরের ১০০ মেগাওয়াট ও মেঘনাঘাটের ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রও উৎপাদনে নেই বর্তমানে।

শিল্পাঞ্চল গাজীপুর ও ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ২১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র। জ্বালানি সংকটের কারণে এ কেন্দ্রও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সংকট নতুন নয়। তবে কোনো কেন্দ্র শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত কিনা সেটির চেয়ে কোথায় বিদ্যুৎ সংকট বেশি এবং কোন কেন্দ্র থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিপিডিবি মেরিট অর্ডার ডিসপ্যাচের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংগ্রহ করে। ফলে যেখানে জ্বালানি পাওয়া যায় এবং উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, সেখান থেকেই বিদ্যুৎ নেয়া হয়।’

দেশের কেন্দ্রগুলো থেকে বিতরণ কোম্পানির কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয় একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রে শুধু সঞ্চালন লোকসানই নয়; ভোল্টেজ, সিস্টেমের স্থিতিশীলতা ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ও জড়িত।

জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিকটবর্তী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুতের ভোল্টেজ, স্ট্যাবিলিটি ও রিলায়েবিলিটি ঠিক থাকে। দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আনলে এসব ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। একই সঙ্গে সঞ্চালন লোকসানের বিষয়টিও রয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালনে এসব সমস্যা কমিয়ে আনতে হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।’

আরও