জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ

আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই ক্ষমতা দেয়া হয়নি বিইআরসিকে

১৪ বছর ধরে মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় আটকে আছে প্রবিধানমালা

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ বিইআরসির হাতে দিলে গণশুনানি ও জবাবদিহির প্রশ্ন আসে। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকার সে ক্ষমতা বিইআরসির কাছে ছেড়ে দেয়নি।

দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু সংস্থাটি এখনো ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায়নি। জানা গেছে, এসব পণ্যের দাম নির্ধারণে বিইআরসি প্রবিধানমালা প্রয়োজন। সে জন্য ২০১২ সালে প্রবিধানমালার ওপর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছিল কমিশন। তবে ১৪ বছরেও প্রবিধানমালা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামত কিংবা সিদ্ধান্ত পায়নি বিইআরসি। সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র বলছে, এসব তরল জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে ছেড়ে দিলে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব খর্ব হতে পারে—এমন ধারণা থেকে বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি।

নির্বাহী আদেশের ক্ষমতাবলে এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় নির্দেশিকার আওতায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করছে সরকার। আইন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করার মূল এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইনটি সংশোধন করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণে সরাসরি ক্ষমতা পায় সরকার। সংশোধিত আইনি ক্ষমতাবলে সরকার যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখন সরাসরি নির্বাহী আদেশে গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন দাম নির্ধারণ করতে পারবে। এরপর ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে আলোচ্য চারটি জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করছে সরকার।

জ্বালানি বিভাগের আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পণ্যগুলোর দাম নির্ধারণ করত। সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির কাছে দিতে বর্তমানে উচ্চ আদালতে রিট রয়েছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।

অভিযোগ রয়েছে, জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের পরামর্শে কৌশলগত এসব জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিষয়ে আওয়ামী সরকার আইন সংশোধন করে। এর মাধ্যমে মূলত সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় পথ তৈরি করা হয়, যেখানে জ্বালানি পণ্য কেনাকাটায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসির কোনো ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, বিপিসির লোকসান মজুদসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকির অজুহাত তুলে সে সময় আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এসব তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের। তার সঙ্গে ছিলেন বেশ কয়েকজন আমলাও।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ বিইআরসির হাতে দিলে গণশুনানি ও জবাবদিহির প্রশ্ন আসে। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকার সে ক্ষমতা বিইআরসির কাছে ছেড়ে দেয়নি। কমিশন দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পেলে জ্বালানি তেল কেনাকাটায় কমিশনসহ বিপিসির নানা অনিয়ম সামনে চলে আসার সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে আকস্মিকভাবে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগও সরকারের হাতছাড়া হবে। এসব কারণেই মূলত বিইআরসির কাছে এ চারটি জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছাড়া হচ্ছে না।

বর্তমানে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে, তবে সেটিও উচ্চ আদালতের নির্দেশে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারও নিজে থেকে বিইআরসির কাছে এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছেড়ে দেয়নি। যে কারণে আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০২১ সাল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে কমিশন।

বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের খুচরা মূল্য নির্ধারণে একটি প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি হয় ২০১২ সালে। কমিশন এ প্রবিধানমালা মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করবে—এমনটা বলা হয় বিইআরসি আইনে। কিন্তু এ প্রবিধানমালায় মতামত দেয়নি তৎকালীন সরকার। এরপর ২০২১ সালে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণে উচ্চ আদালতে রিট করে ক্যাব। ওই রিটে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পেট্রোলিয়াম পদার্থ মজুদকরণ, বিপণন ও বিতরণ ট্যারিফ প্রবিধানমালা ২০১২’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (পেট্রোলিয়াম পদার্থ পরিবহন ট্যারিফ) প্রবিধানমালা ২০১২’ এবং ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের খুচরা ট্যারিফ প্রবিধানমালা, ২০১২’—সমন্বিত তিনটি প্রবিধানমালার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা চায় ক্যাব, যা এখনো আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিইআরসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রবিধানমালা মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হলেও তা আটকে থাকে দীর্ঘদিন। এরপর ২০২৩ সালে আবারো পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবারো তা মতামত গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়, কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মতামত দেয়া হয়নি।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিইআরসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করতে বিইআরসির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও মন্ত্রণালয় জনগুরুত্বসম্পন্ন তরল জ্বালানি পণ্যগুলোর দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসি হাতে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। অনেকে হয়তো মনে করেন এতে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব কমে যেতে পারে। সরকারের অর্থ প্রয়োজন হলে সে সুযোগও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সে সময় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব জ্বালানি পণ্যের দাম কমিশনের হাতে ছেড়ে দিলে তারা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন ঝুঁকির কথা ভেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।

দীর্ঘ সময় ধরে বিইআরসি প্রবিধানমালা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তরল জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হলে বিইআরসির প্রবিধানমালা আগে চূড়ান্ত হতে হবে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে সে প্রবিধানমালা আটকে আছে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও বেশ কয়েকবার মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে তিনটি প্রবিধানমালা একই রকম হওয়ায় তিনটির পরিবর্তে একটি করার কথা জানায় মন্ত্রণালয়, সেটাও চূড়ান্ত করে মতামতের জন্য পাঠানো হয়, কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।’

ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতির আওতায় নির্ধারণ করছে সরকার। তবে এ দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হিসাব, পাচারের শঙ্কা নিয়ে তথ্য, কোন পণ্যের দাম কত পড়ছে—এসব বিষয় সরাসরি জানার সুযোগ নেই ভোক্তার। বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের দেয়া হিসাবের ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রণালয় দামের প্রজ্ঞাপন জারি করে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিংবা বর্তমান সরকারের সময়েও একইভাবে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। রোববার চার ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। এরই মধ্যে পরিবহন ভাড়া, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসির সাবেক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয় ছাড়তে চায় না। কারণ এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় উৎস। বিভিন্ন সময় এ জ্বালানি পণ্য আমদানিতে যুক্ত অনেকের বিরুদ্ধে কেনাকাটা, কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বিইআরসি ক্ষমতা পেলে এসব অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে যাবে।

বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রবিধানমালা আটকে থাকার পেছনে মূল কারণ কর্তৃত্ব। জ্বালানি বিভাগ এ কর্তৃত্ব ছাড়তে চায় না। এর বাইরে আর কিছু না। বিইআরসির হাতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ ক্ষমতা ছেড়ে দিলে তেল কেনাবেচার যে বাণিজ্য তার পুরো হিসাব বিইআরসির হাতে চলে আসবে। দাম বাড়াতে গেলে যৌক্তিক কারণ নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে আসতে হবে। তাই অতীতের সরকারগুলো সবসময়ই এ নিয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের ধারণা সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব খর্ব হতে পারে। যে কারণে এ প্রবিধানমালা পাস করা যায়নি।’

দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির কাছে দেয়ার দাবি ক্যাবের। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণে বিইআরসির ক্ষমতা নিশ্চিতে উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি রিট রয়েছে। এরই মধ্যে তারা এলপিজির দাম নির্ধারণে বিইআরসির ক্ষমতাসংক্রান্ত একটি রিটের আদেশ পেয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিইআরসি আইনে সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কমিশনের। এর জন্য বিইআরসি মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে প্রবিধানমালা তৈরি করবে। কিন্তু সেই মতামত মন্ত্রণালয় আজও দিতে পারেনি। মূলত এ মতামতের পেছনে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব জড়িত। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ বিইআরসির হাত যাক এটা মন্ত্রণালয় চায় না, কারণ এ ক্ষমতা বিইআরসিকে দেয়া হলে তাদের কর্তৃত্ব চলে যাবে। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ভোক্তার কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ বিইআরসির হাতে দেয়ার বিষয়ে রিট করেছিলাম। ক্যাব আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।’

আরও