বেশ কয়েক বছর ধরেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণে দেশের শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাত্রার প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশীদের বিদেশে শিক্ষার ব্যয় ছিল ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশী মুদ্রায় ব্যয়কৃত এ অর্থের পরিমাণ ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। কেবল ব্যয় নয়, বরং সংখ্যার দিক থেকেও এখন সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে এমনটাই দেখা যায়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়গুলো তাদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে। অনেকে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করেছিলেন। কথা উঠেছিল ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ শুরু হবে। কিন্তু তেমনটা বাস্তবে দেখা যায়নি। অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা, সরকারি নিয়োগে ধীরগতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকায় তরুণ শিক্ষার্থীদের হতাশা দূর হয়নি। ফলে উন্নত জীবনের নিশ্চয়তায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত আছে এবং বেশির ভাগই বিদেশে যাচ্ছেন স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য গেছেন ৫৫টি দেশে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ এবং ২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন। আর মোটামুটি এক দশক আগে ২০১৩ সালে বিদেশে পড়তে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১০ বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষাকে বিদেশ গমনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং তাদের বেশির ভাগ আর দেশে ফিরছেন না।
ডেনমার্কের অ্যালবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপে (স্নাতকোত্তর) অধ্যয়নরত জাহিদুল ইসলাম সে দেশেই স্থায়ী হতে চান। বণিক বার্তাকে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে শিক্ষার মান ভালো। বাংলাদেশে স্নাতক শেষে করে ১৫ হাজার টাকার বেতনের চাকরিতেও যোগদান করতে হয়। অথচ বিদেশে একই ডিগ্রি শেষে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা বেতন পাওয়া যায়। আবার দেশে জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই কিন্তু বিদেশে জীবনের নিরাপত্তা, উন্নত জীবন দুটোই নিশ্চিত হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সবাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। তাই উন্নত জীবনের জন্য শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা বিগত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এক্ষেত্রে ব্যয়ও ক্রমেই বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ব্যয় করেছেন ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ব্যয় ছিল ৫৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ ব্যয় আড়াই গুণের বেশি বেড়েছে। আর শুধু বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
জার্মানির নিদারাইন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সে পড়ছেন সুমাইয়া রশিদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জার্মানির সঙ্গে আমাদের দেশের শিক্ষার মানের আকাশ-পাতাল তফাৎ। জার্মানিতে ইন্টার্নশিপের সময় চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশ এ চাকরি খোঁজার জন্য আলাদা জব কোচিং সেন্টারে পড়ার দরকার হয়। এককথায় পড়াশোনার সঙ্গে জবের রিলেশনশিপ বিল্ডআপ করতেই অনেক সময় চলে যায়। এছাড়া বিদেশে সামাজিক নিরাপত্তা রয়েছে, যা দেশে নেই।’
শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের প্রবণতার পেছনে কর্মসংস্থানের ঘাটতি মুখ্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় তরুণদের দেশ ত্যাগের পেছনে মূল কারণ কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা। সামাজিক-রাজনৈতিক কারণও আছে, তবে কর্মহীনতাই মূল কারণ। দেশে প্রকৃত শিল্পায়ন না হওয়ায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হয়নি। একজন তরুণ শিক্ষাজীবন শেষে বুঝে উঠতে পারছে না সে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে। সে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চার লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করতে বিদেশে গেছেন। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে তরুণরাও বিদেশে ছুটছেন। আমাদের তরুণদের দেশে রাখতে চাইলে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত কর্মজীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। চীনসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে গত চার দশকে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তাদের শিল্পক্ষেত্রে। বাংলাদেশে সেটা ঘটেনি। তরুণদের উৎপাদনশীল কর্মে নিয়োজিত করতে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই।’
বর্তমানে দেশের বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষের দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের ‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৯৯ জন। আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এ সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেশি। এ বৃদ্ধি বাংলাদেশকে এক বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাঠানো দেশের তালিকায় ১৩তম স্থান থেকে অষ্টম স্থানে নিয়ে এসেছে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে যেখানে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮০২ জন, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৯ জনে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে সম্প্রতি স্নাতক সম্পন্ন করেছেন রিয়াদ হোসেন (ছদ্মনাম)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন। রিয়াদ বলেন, ‘দেশে ভালো চাকরির সুযোগ যেমন নেই, তেমনি জীবনের নিরাপত্তাও নেই। আবার আমাদের সমাজে সম্মানজনক চাকরি বলতে সবাই সিভিল সার্ভিসকে বোঝে। অথচ একটা বিসিএস সম্পন্ন হতে প্রায় চার-পাঁচ বছর চলে যায়। অথচ এ সময়ে আমি বিদেশে ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারব। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এ জায়গাগুলোয় আমরা পরিবর্তন আশা করেছিলাম কিন্তু এখন আর তেমন কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না।’
তবে শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের প্রবণতার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ। তিনি বলেন, ‘বিদেশগামী শিক্ষার্থী সংখ্যায় ভারত শীর্ষে রয়েছে। তাদের শিক্ষার্থীরাই বর্তমানে অ্যামাজন, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে এবং এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরাও অত্যন্ত মেধাবী, তারা এসব প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে যেতে পারলে তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের দেশে রাখার বিষয়েও সচেষ্ট হতে হবে। এ কারণে মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।’
বিদেশগামী শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কোথায় পড়বে, এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতা। কোনো শিক্ষার্থীর যদি বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ থাকে এবং অভিভাবকও যদি তাকে বিদেশে পড়াতে চান তাহলে সেটি তারা করতে পারেন। এক্ষেত্রে বাধা দেয়া উচিত নয়। এ প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে আমাদের দেশীয় শিক্ষার মানের উন্নতি ঘটিয়ে। সেই প্রয়াসটাই আমাদের করতে হবে, এটিই মূল বিষয়। আমাদের কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়তো হয়েছে কিন্তু শিক্ষার মান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গুণগত দক্ষতায় ততটা উন্নতি ঘটেনি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের সংকট রয়েছে।’
বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীরা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এখনো তৈরি হয়নি। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে বলেই আমাদের এ কর্মসংস্থানের ঘাটতি অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। আর বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের সময়ে কেউ বিদেশে চলে গেলেই তাকে আমরা হারিয়ে ফেলছি এমনটা নয়। বিদেশে থেকেও তারা বিভিন্নভাবে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে আমাদের ব্যর্থতা হলো যে আমরা এখনো তাদের সেভাবে সংযুক্ত করতে পারিনি। এটা আমাদের করতে হবে। মেধাবী দক্ষ-প্রবাসীদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে চলে যাওয়াকে “ব্রেইন ড্রেইন” ভেবে শঙ্কিত না হয়ে বরং আমরা যদি এভাবে ব্রেইন সার্কুলেশনের একটি সুযোগ তৈরি করে দেই তাহলে ব্যক্তির স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ন হবে না, আবার রাষ্ট্রও লাভবান হবে।’
শিক্ষা উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘প্রতিটি মানুষের কাছেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সময়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির প্রভাব, নির্যাতন-হয়রানির মতো ঘটনা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের শঙ্কিত করেছে এবং বিদেশে পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ পায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেয়া যাবে না যেখানে নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন।’