চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে বেকায়দায় অভিভাবকরা

চমেক হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে আইসিইউ সংকটও। জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হচ্ছে। এদিকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো

চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন অভিভাবকরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে আইসিইউ সংকটও।

জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হচ্ছে। এদিকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই হাজারের বেশি শিশু।

১০ মাস বয়সী সায়েমকে নিয়ে গত রোজার ঈদের পর থেকেই হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটছেন বাবা রেজাউল করিম। বাঁশখালীর বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে নগরীর দুই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর গত ২৬ দিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সায়েম। রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার ১০ মাসের বাচ্চা গত রোজার ঈদের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুরুতে জ্বরের পাশাপাশি সর্দি ও কাশি ছিল। শ্বাসকষ্টও দেখা দিয়েছিল। ছয়দিন আগে ওর হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন নিয়মিত অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হচ্ছে। বাচ্চার চিকিৎসা করতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন থেকে টাকা ধার করে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। এখনো সুস্থ হয়নি।’

সায়েমের মতো চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের স্বজনদের মুখে দেখা গেছে আতঙ্কের ছাপ। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের এক বেডে কয়েকজন শিশুকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। শিশুদের অভিভাবকরা দাবি করেন, ডাক্তার সকালে এসে একবার দেখে যায়। সারা দিনে খোঁজখবর থাকে না। নার্সরা নিয়মিত ডিউটি পালন করলেও ডাক্তারদের কাছে শতভাগ চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না।

৫ বছর ৭ মাস বয়সী মায়েশা জান্নাত ও ৩ বছর ৭ মাস বয়সী মরিয়মকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন মা রাবেয়া। পটিয়ার সুবনদণ্ডী এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার দুই মেয়েকে হাসপাতালে গত পাঁচদিন ধরে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বাচ্চা দুটোরই জ্বর আছে। তবে হামে আক্রান্ত হয়েছে কিনা বলতে পারছি না। টাকার অভাবে চিকিৎসা কীভাবে চালিয়ে যাব সেটাই বুঝতে পারছি না।’

অর্থ সংকটের কারণে ১৪ মাস বয়সী শিশু সাইফনের বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারছেন না মা কাউসার বেগম। তিনি বলেন, ‘গত সাতদিন ধরে হাম ওয়ার্ডে আমার বাচ্চা চিকিৎসাধীন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়া এবং অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়ায় গত চারদিন আগে আইসিইউতে ভর্তি করা হলেও আজ (গতকাল) আবারো তাকে ওয়ার্ডের বেডে পাঠিয়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা। এখন বিভিন্ন টেস্ট করার জন্য বলেছে। কিন্তু আমার কাছে এত টাকা নেই যে সেই টেস্টগুলো করাব। বাচ্চার সারা শরীরে কালো কালো খোস-পাঁচড়ার মতো দাগ হয়ে গেছে। গায়ে জ্বরের পাশাপাশি বাচ্চার অক্সিজেন লেভেলও কমে গেছে।’

চমেক হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের শিশুদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, হাম আক্রান্ত বা উপসর্গ আছে এমন প্রায় সব শিশুই জ্বরে আক্রান্ত এবং নিউমোনিয়ার সংক্রমণ আছে। এর পাশাপাশি শিশুদের অক্সিজেন লেভেলও কমে যাওয়ায় বেশির ভাগ শিশুকেই অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে নেবুলাইজার ব্যবহার করার পাশাপাশি স্যালাইন দেয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়ার্ডের একজন নার্স জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আইসিইউ থাকলেও সেটিও পর্যাপ্ত নয়। জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন হলেও অনেককে পাঠাতে পারছি না। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন রোগী বিভিন্ন জেলা থেকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতালে শিশুবিভাগ ও আইসিইউ মিলে গড়ে প্রতিদিন শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। হামের বাইরে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ছাড়াও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন আরো অনেক রোগী।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, চমেকের আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত কিংবা উপসর্গ নিয়ে যারা ভর্তি হয়েছে তাদের গুরুত্বের সঙ্গে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে সার্বক্ষণিক নার্সরা কাজ করছেন। ওয়ার্ডে জরুরি সেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসক উপস্থিত থাকছেন।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে গত ২৪ ঘণ্টায় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৩৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়েছে ৮৮ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৮৯ জন। হামের উপসর্গে নয় শিশু মারা গেছে। হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট তিনজনের।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ঈদের ছুটি থাকলেও হাসপাতালগুলোতে যাতে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক থাকে, সেজন্য ডাক্তারদের রোস্টার করে ডিউটি পালন করতে বলা হয়েছে। উপজেলা হাসপাতাল ছাড়াও নগরীর সব হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে যারা ভর্তি হয়েছেন, তাদের চিকিৎসাসেবায় যাতে কোনো গাফিলতি না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।’

আরও