চাঁদপুরে ৪৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট

মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

চাঁদপুরে আট উপজেলায় ১ হাজার ১৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে।

চাঁদপুরে আট উপজেলায় ১ হাজার ১৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি না দেয়ায় এবং অবসরের কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম।

অভিভাবকরা বলছেন, মানসম্পন্ন শিক্ষার পূর্বশর্ত হলো প্রয়োজনীয় শিক্ষক, পর্যাপ্ত শ্রেণী কক্ষ ও উপযুক্ত পরিবেশ। এসবের কোনো একটির কম হলে সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক না থাকলে পাঠদানে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ কারণে মানসম্পন্ন শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।

জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব ভাওয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে সাতটি। তবে সেখানে রয়েছেন মাত্র একজন। দুই শিফটে ছয়টি শ্রেণীর নিয়মিত ১০০-১০৫ শিক্ষার্থী উপস্থিতি থাকলেও একাই পাঠদান করতে হচ্ছে তাকে।

বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক শান্তি রানী ধর অবসরে গেলে তিন শিক্ষক মিলে বিদ্যালয়ের পাঠদান চালিয়ে নিচ্ছিলেন। এ তিনজনের মধ্যে নুরুন্নাহার নামে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও তিন মাস আগে মারা যান। এরপর দুজন সহকারী শিক্ষক মিলে বিদ্যালয়টির হাল ধরেন। তাদের মধ্যে তানিয়া আক্তার নামে এক শিক্ষক শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে অবসরে চলে যান। একমাত্র শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন ফাতেমা আক্তার। সবকিছু সামলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘এমন প্রেক্ষাপটে একজন অস্থায়ী শিক্ষককে আনা হয়। শিক্ষক না থাকায় সকালে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ক্লাস শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে অস্থায়ী শিক্ষকের সহযোগিতায় সবক’টি শ্রেণী কক্ষে পাঠদান করাতে হয় তাকে। এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে পাঠদান ও বিদ্যালয়টির দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে আমি নিজেও মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘অভিভাবকদের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয় এলেও শিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আফতাবুল ইসলামকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন সত্য। তবে এমন পরিস্থিতিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে একজন শিক্ষক দেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক পদায়নে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।’

ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌলি মণ্ডল জানান, বিদ্যালয়টির শিক্ষক সংকটের বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন।

চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১৫৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৮৯টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। এছাড়া ৩৩০টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৮ হাজার ১৩০ জন। শিক্ষার্থী রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৩৫০ জন। ক্লাস্টার রয়েছে ৪৬টি ও সাব-ক্লাস্টার ২২৫টি। শিক্ষার্থী ভর্তির হার ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

শুধু বিদ্যালয়ে নয়, শিক্ষা অফিসেও রয়েছে জনবল সংকট। উচ্চমান সহকারী, নিম্নমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহায়কসহ ৫৫টি পদে জনবল শূন্য রয়েছে।

অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, বছরে জেলার প্রতি বিদ্যালয়ে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার এবং ঊর্ধ্বে ৭০ হাজার দৈনন্দিন খরচের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। স্কুল বুঝে বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বরাদ্দে মূলত চক, ডাস্টার, খেলাধুলাসহ অফিশিয়াল আনুষঙ্গিক খরচ করা হয়, যা স্লিপের মাধ্যমে দেয়া হয়। তবে কিছু স্কুলে এ বরাদ্দ পুরোপুরি খরচ করা হয় না।

শিক্ষক সংকটের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট রয়েছে। সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে ৩৩০টি। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ এবং প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি হবে। এছাড়া উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী পদেও নিয়োগ হবে। পদোন্নতি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ হলে প্রাথমিক শিক্ষা আরো বেগবান হবে।’

আরও