টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে চলতি মাসের শুরুতেই ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদী রক্ষা বাঁধের ১৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। প্লাবিত হয় অন্তত ৪৩টি গ্রাম। তলিয়ে যায় ফুলগাজী-পরশুরাম সড়ক। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়কগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যায়। ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতিও হচ্ছে। এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। ভেঙে গেছে বেশির ভাগ সড়ক। শুধু সড়ক নয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও সড়ক বিভাগসহ কয়েকটি সরকারি দপ্তর এরই মধ্যে ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ১ আগস্ট রাত থেকেই মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। ২ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে পরশুরামে নদী রক্ষা বাঁধের দুটি স্থান ভেঙে এবং ফুলগাজীতে বাঁধ উপচে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হতে থাকে। তিনদিনে নদী রক্ষা বাঁধের ১৫টি স্থান ভেঙে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার ৪৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রশাসনের হিসাব মতে, অন্তত ২৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ফুলগাজী-পরশুরাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ভেসে যায় মৎস্য খামারের কোটি কোটি টাকার মাছ ও পোনা। ডুবে যায় রোপা আমনের বীজ ও শীতকালীন সবজি। পানির স্রোতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয় সড়কগুলোয়। কোনো কোনো এলাকায় রাস্তা ভেঙে গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়েও আনা হয়।
মির্জানগর গ্রামের বাসিন্দা আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘চলতি বছরের মতো বন্যা আর কখনো দেখিনি। বন্যার পানিতে আমাদের বাড়িঘর ও মাছের ঘের ডুবে গেছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পরিস্থিতির উন্নতির পর বাড়িতে এসে দেখি ঘরের আসবাবপত্রসহ অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। খামারের মাছগুলো ভেসে গেছে। এতে আমার প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
মো. খলিল উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এ অঞ্চল উঁচু হওয়ায় সাধারণত বন্যার পানি প্রবেশ করে না। কিন্তু এবার ভারী বর্ষণে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় এখনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। রাস্তাঘাট যে পরিমাণ ভেঙেছে তা দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা না হলে পরশুরাম ও ফুলগাজীতে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে না।’
মির্জানগর ইউনিয়নের আবদুস সালাম বলেন, ‘এবারের বন্যায় মানুষ অনেকভাবে ক্ষতির কবলে পড়েছে। কৃষকের বীজতলা ও শীতকালীন আগাম সবজি নষ্ট হয়েছে। পুকুর ও মাছের খামার ভেসে গেছে। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। তা না হলে এসব এলাকার মানুষ নানা সূচকে পিছিয়ে পড়তে পারে।’
চিথলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বারবার লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। এক মাস আগে ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে গড়িমসির কারণে আবারো একই স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।’
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘৪ আগস্ট মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। বন্যা পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হওয়ার পর বরাদ্দ সাপেক্ষে নদী রক্ষা বাঁধের ভাঙনকবলিত স্থানগুলো মেরামত করা হবে।
এর আগে, জুনের শেষ দিকে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পানিতে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় মুহুরী নদীর বাঁধের একাধিক স্থানে ভেঙে অন্তত ৪৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই ফের বন্যায় এসব এলাকার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
ফেনীর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ আল ফারুক বলেন, ‘দুবারের বন্যায় ফুলগাজী ও পরশুরামে অনেক রাস্তার পিচ উঠে গেছে। রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। উপজেলাগুলো থেকে কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন প্রস্তুত করছেন। দ্রুত সড়কগুলো মেরামতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক শাহীনা আক্তার বলেন, ‘দুই দফা বন্যায় ফুলগাজী ও পরশুরামে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’