শিশুর জন্মনিবন্ধন

সেবা পেতে দীর্ঘ ভোগান্তি বেশি বিড়ম্বনায় প্রথমবার স্কুলে ভর্তিচ্ছুদের অভিভাবকরা

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪ সালের পর জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় একাধিক প্রযুক্তিগত ও নীতিগত পরিবর্তন এসেছে। ২০০৪ সালে আইন পাসের সময় নিবন্ধন ব্যবস্থা বর্তমানের মতো পুরোপুরি ডিজিটাল ছিল না।

আগামী শিক্ষাবর্ষে পাঁচ বছরের মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকার বাসিন্দা মুনিরা জান্নাত। সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে প্রথমে নিজের ও স্বামীর জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন তিনি। ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয় দেখিয়ে একাধিক কার্যালয়ে যেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। একপর্যায়ে তার ১৬ বছর আগে মারা যাওয়া শ্বশুরের মৃত্যুসনদও চাওয়া হয়। মুনিরার ভাষ্য, কয়েক বছর আগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের সময় তার নিজের জন্মনিবন্ধন সনদে নামের বানানে ভুল হয়। সেই ভুল সংশোধন করাতে গিয়ে নির্ধারিত ফির বাইরে ১-২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে সন্তানকে প্রথমবার স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়া অনেক অভিভাবকই জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত এমন জটিলতার মুখে পড়ছেন। স্কুলে ভর্তিসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় শিশুর জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হয়। ২০১৩ সালের পর জন্ম নেয়া শিশুর জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন নম্বরও প্রয়োজন হচ্ছে। এজন্য মা-বাবার জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনলাইন ব্যবস্থায় থাকতে হয়। ফলে যেসব অভিভাবকের জন্মনিবন্ধন আগে করা হলেও তা অনলাইনে নেই, কিংবা সনদের তথ্যের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ঠিকানার অমিল রয়েছে, তাদের আগে নিজেদের জন্মনিবন্ধন অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা বা তথ্য সংশোধন করতে হচ্ছে। এতে শিশুর জন্মনিবন্ধনের আগে মা-বাবার নথি ঠিক করতে গিয়েই বাড়তি সময় ও ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেকে।

ভর্তিচ্ছু শিশুদের কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ প্রক্রিয়ায় তাদের কেউ কেউ একাধিক কার্যালয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও সার্ভার জটিলতা, কোথাও মা-বাবার নথিতে নাম বা ঠিকানার অমিল, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনার কারণে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে দালালের সহায়তা নেয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। ফলে সন্তানের স্কুলে ভর্তির সময় ঘনিয়ে এলে জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ বা সংশোধন নিয়ে চাপে পড়ছেন অভিভাবকরা।

২০২২ সালের শেষ দিকে কন্যাসন্তানকে স্কুলে ভর্তির জন্য জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব পদমর্যাদার এক দম্পতি। এজন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কর্মরত তাদের কয়েকজন ব্যাচমেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও সার্ভার জটিলতার কারণে এক মাসে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেননি। পরে সন্তানের দাদার বাড়ি কুমিল্লায় তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সহায়তায় এক-দুইদিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বর্তমানে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুর জন্মনিবন্ধন করানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেও এক মাসে জন্মনিবন্ধনটি সম্পন্ন করতে পারিনি। রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার আমার মতো অনেককেই এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরে কুমিল্লা থেকে মেয়ের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করি।’

গত বছর সন্তানকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করাতে গিয়ে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন সালমা বেগম। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, বিদ্যালয়ের ভর্তি ফর্ম পূরণের জন্য শিশুর অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সন্তানের নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় গিয়ে জানতে পারেন, ২০১৩ সালের পর জন্ম নেয়া শিশুর ক্ষেত্রে বাবা ও মা উভয়েরই অনলাইন জন্মনিবন্ধন থাকতে হয়। তার নিজের জন্মনিবন্ধন অনলাইনে না থাকায় প্রথমে সেটি করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘এরপর শুরু হয় এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যাওয়া। বাবা-মায়ের সনদে বানানের অমিল, এনআইডির সঙ্গে ঠিকানার গরমিল এবং আঞ্চলিক কার্যালয়ের সার্ভার জটিলতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়ে যায়। একসময় মনে হয়েছিল, শিশুকে হয়তো ভর্তি করাতেই পারব না। শেষ পর্যন্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছুটা সময় দেয়ায় তিন মাস পর জন্মনিবন্ধন সনদ জমা দিতে পেরেছি।’

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো শিশুর জন্মসনদ না থাকলে তাকে সাময়িকভাবে ক্লাসে বসার সুযোগ দেয়া সম্ভব হলেও উপবৃত্তি বা সরকারি সুবিধার তালিকার মতো ডিজিটাল ডেটাবেজে তাকে যুক্ত করা যায় না। জন্মসনদ ছাড়া শিশুটি হয়তো প্রাথমিক ক্লাসে পড়ালেখা করতে পারবে, তবে সনদ না থাকা পর্যন্ত সে কোনো সমাপনী বা বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আইনি যোগ্যতা লাভ করবে না।

আইন অনুযায়ী, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৪৫ দিন পর্যন্ত কোনো ফি লাগে না। পাঁচ বছর পর্যন্ত নিবন্ধনে ২৫ টাকা এবং পাঁচ বছরের পর ৫০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে। তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে ফি ৫০-১০০ টাকা। তবে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় নির্ধারিত ফির বাইরে ২-৯ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করে দালালের সহায়তা নেয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, দালালনির্ভরতা কমাতে আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইন করা হয়েছে। কিন্তু অনেক আবেদনকারী অন্যের মাধ্যমে আবেদন করায় তথ্য এন্ট্রিতে ভুল হচ্ছে, যা পরে সংশোধনের সময় নতুন জটিলতা তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৪ সালের পর জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় একাধিক প্রযুক্তিগত ও নীতিগত পরিবর্তন এসেছে। ২০০৪ সালে আইন পাসের সময় নিবন্ধন ব্যবস্থা বর্তমানের মতো পুরোপুরি ডিজিটাল ছিল না। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অনলাইন নিবন্ধন, বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে তথ্য সংযোগ এবং মা-বাবার জন্মনিবন্ধনের তথ্য যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা চালু হয়। বর্তমানে ২০১৩ সালের পর জন্ম নেয়া শিশুদের জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন নম্বর প্রয়োজন হচ্ছে। ২০২১ সালে জন্মনিবন্ধন সনদের ব্যবহার পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। ২০২২ সালে এপিআই-সংক্রান্ত জটিলতায় জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই সুবিধা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। পরে ২০২৩ সালে বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় সনদ মুদ্রণের ব্যবস্থা চালু হলে পুরনো এক ভাষার সনদধারীদের অনেকেরই তথ্য হালনাগাদের প্রয়োজন পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শতভাগ জন্ম ও ৮০ শতাংশ মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই নিবন্ধন ব্যবস্থায় এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, জটিলতার একটি বড় অংশ কারিগরি। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করায় সার্ভারের ওপর চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি জন্মনিবন্ধনের তথ্য নির্ভুল ও স্বচ্ছ রাখতে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কঠোর রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মাছুম বিল্লাহ্‌ বণিক বার্তাকে জানান,”জন্মনিবন্ধনের সফটওয়্যারটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য না দিলে তা সাবমিট করা যায় না। পলিসি অনুযায়ী সবার জন্ম ও তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করতেই হয়তো এটি করা হয়েছে। বর্তমানে মানুষ যখন শিশুর জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করে, তখন পিতা-মাতার নিবন্ধনের নম্বরগুলো না দিলে আবেদনটি সাবমিটই হতে পারে না। ফলে আগে পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করে নিতে হয় এবং তারপর শিশুর নিবন্ধনের কাজ করতে হয়।”আবেদনের স্থান নিয়ে জটিলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আবেদনকারী তার জন্মস্থান ঢাকা দেখালে ঢাকা থেকেই নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। আমাদের কাজ হলো আবেদনকারীর দেয়া কাগজপত্র ও তথ্য সঠিক আছে কিনা তা যাচাই করে দেখা। কাগজপত্র ঠিক থাকলে অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা জেলা পর্যায়ে চলে যায়।

কিন্তু এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিসের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক নাগরিকের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে হলেও তাদের এনআইডিতে বর্তমান বসবাসরত এলাকার নাম থাকে। সেজন্য ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় বা মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলো আবেদনকারীদের গ্রামে বা জন্মস্থানে পাঠিয়ে দেয়, যা ভুল।

এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জন্মনিবন্ধন সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। সন্তানের নিবন্ধনের আবেদনের সময় পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায়, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবক পূর্বে জন্মনিবন্ধনের বাইরে ছিলেন, তাদের নিবন্ধনের বিষয়টিও একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এজন্য স্কুলে সব শিশুর ভর্তির ক্ষেত্রে পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হয়। পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন করা থাকলে বাচ্চার জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করা যায়, যা চূড়ান্তভাবে অভিভাবকদের জন্যই সুবিধাজনক।’

আরও