কুমিল্লায় গ্রেফতার ২৭ কিশোরকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে: ডেপুটি জেলার

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, উঠতি বয়সি কিশোররা যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না পারে সেজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, এ বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ২৭ জন কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লা ডেপুটি জেলার জান্নাতুল রাকিবা।

এদিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, চলমান অভিযানে কারাগারে বন্দির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেড় হাজার বন্দির ধারণক্ষমতার কারাগারটিতে আজ সকালে বন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০ জনে। ফলে প্রচণ্ড গরমে কারা বন্দিদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের ছেলে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে দুই কিশোরকে গত ২১ সেপ্টেম্বর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে গাজীপুর পাঠানো হয় এবং এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু হয়। পাঁচ দফার এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪২ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম চার দফায় ১ হাজার ৬৭২ জন এবং পঞ্চম দফায় ৩৭০ জনকে আটক করা হয়।

এ দিকে কুমিল্লা নগরীর অন্যতম শীর্ষ কিশোর গ্যাং লিডার ইমরান হোসেন ওরফে রতনসহ (২৪) গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোর গ্যাং সদস্য সন্দেহে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

এদের মধ্যে অপরাধের সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল বিকেলে ২৭৯ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকি ৯১ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে ।

পুলিশ সূত্র জানায়, গ্যাং লিডার রতন কুমিল্লা নগরীর ছোটরা এলাকার মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশেমের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক মেসেঞ্জারে ‘রতন গ্রুপ’ (র স্কোয়াড) নামে একটি গ্রুপের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন । এই গ্রুপে ছাত্র, টোকাই ও খেটে খাওয়া মানুষসহ অন্তত ৪০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। তারা নগরীর ধর্মসাগর এলাকা, ঈদগাহ, ফোজদারি মোড় এবং আদালত এলাকায় চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভাড়ায় জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া এ গ্রুপটি মাদক বিক্রয় ও সেবনের সঙ্গেও জড়িত।

কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানায়, কুমিল্লা নগরীতে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জবর দখলকারী এবং মাদক বিক্রয়-সেবনসহ বিভিন্ন কিশোর অপরাধের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ‘রতন গ্রুপ’। গ্রুপ প্রধান ইমরান হোসেন রতনের বিরুদ্ধে খুনসহ কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় ৯টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি একাধিকবার জেলও খেটেছেন। তবে জেল থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, অভিযানে রতনের আরেক সহযোগী সাইফুল ইসলামকে (২২) গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অপরাধে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় ১০টি মামলা রয়েছে।

একই অভিযানে ক্রাইম সেটাপ গ্যাংয়ের শীর্ষ দলনেতা মো. সাব্বির ওরফে পয়েন্ট সাব্বির (২৪) ও রবিউল ইসলাম নবী ওরফে কিং মেকার কে (২৪) গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দুই জনের বিরুদ্ধেও কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় একটি করে মামলা রয়েছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, কিশোররা যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না পারে সেজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, এ বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনের সড়কে শাহাদাত হোসেন নামের এক কিশোরকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনায় রতনের নাম আসে। ওই মামলায় র‍্যাব ছয়জনকে গ্রেফতার করেছিল। তখন র‍্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মামলার প্রধান আসামি রতন রতন গ্রুপের প্রধান এবং হত্যাকাণ্ডের হোতা।

এছাড়াও ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা নগরের সার্কিট হাউস মোড় এলাকায় রতন ও ইগল গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ দুই পক্ষের ১৬ জনকে গ্রেফতার করে।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল নগরের রানীর দিঘিরপাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন পক্ষের অস্ত্রের মহড়া হয়। পরদিন রাতে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে রতনসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।

আরও