নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়ার বিস্তার উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়

২৩ মাসে সদর হাসপাতালেই ভর্তি দুই হাজারের বেশি রোগী

সাতক্ষীরার কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে আশাশুনি একটি। উপজেলার বসুখালী গ্রামের বাসিন্দা লাভলু হোসেনের যমজ মেয়ে শিরিনা খাতুন (১৭) ও শিউলি খাতুন (১৭)।

সাতক্ষীরার কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে আশাশুনি একটি। উপজেলার বসুখালী গ্রামের বাসিন্দা লাভলু হোসেনের যমজ মেয়ে শিরিনা খাতুন (১৭) ও শিউলি খাতুন (১৭)। তারা দুজনই বসুখালী দারুল দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। যমজ দুই বোনের বয়স যখন তিন মাস তখনই ধরা পড়ে তারা থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। এর পর থেকে তাদের শরীরে নিয়মিত রক্ত দেয়াসহ চিকিৎসা শুরু করে পরিবার। ১৩ বছর বয়সে তাদের থ্যালাসেমিয়া অপারেশন করা হয়। তবে সে সময় পর্যন্ত লাভলু হোসেনের খরচ হয়েছে প্রায় ২২ লাখ টাকা। তবু ঘাতক রোগ থেকে মুক্তি মেলেনি তার কন্যাদের। এখনো প্রতি মাসে রক্তের জোগাড় করতে হয় তাকে।

লাভলু হোসেন জানান, এ রোগে আক্রান্ত হলে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া যায় না—এমনটিই জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। যতদিন বাঁচবে রক্ত দিয়ে যেতে হবে। তার মাছের ব্যবসা ছিল। সচ্ছলভাবে চলছিল সংসার। কিন্তু মেয়েরা থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা করাতে নিজের উপার্জিত অর্থের পাশাপাশি জমিজমা হারিয়েছেন। তবু মেয়ে দুটিকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারেননি। সর্বশেষ একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতভিটাও বিক্রি করে মেয়েদের চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন। এখন ছিন্নমূল পরিবার হিসেবে বসবাস করছেন আশাশুনির হাওড়া নদীর চরে।

যদিও চিকিৎসকদের দাবি, রোগটি পরিবার থেকে পরিবারে বিস্তার করে। কিন্তু লাভলু হোসেনের দাবি, তার পরিবার বা পূর্বপুরুষ কারো এ রোগ ছিল না। তার পরিবারে কেবল তার দুই মেয়ের হয়েছে।

থ্যালাসেমিয়া এক ধরনের রক্তশূন্যতা, যেটা জন্মগতভাবে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে বংশপরম্পরায় চলতে থাকে। নীরব ঘাতক এ ব্যাধি ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটাচ্ছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়, যা রীতিমতো স্বাস্থ্য বিভাগকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ২৩ মাসে ২ হাজার ৩৬ জন নারী, শিশু ও পুরুষ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালেও অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীরব এ ঘাতক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে জনসাধারণকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে—ছেলে-মেয়ে বিয়ে দেয়ার আগে রক্তে থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য। কারণ এটি জেনেটিক রোগ। তবে বিয়ের আগে ছেলে বা মেয়ে কারো একজনের শরীরে থ্যালাসেমিয়া থাকলে তাদের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন করা যাবে। কিন্তু ছেলে-মেয়ে উভয়ের রক্তে যদি রোগটি থাকে তবে বিয়ে না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’

কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ ভাদিয়ালী গ্রামের সিরাজুল ইসলামের দুই মেয়ে জান্নাতুল নাহার পপি (২৬) ও সামিয়া নাজনিন (২১)। দুজনেই কলেজে পড়েন। শৈশব থেকেই তারা দুজনই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি মাসে সাতক্ষীরা সদর হাসাপাতালে তাদের রক্ত গ্রহণ করতে আসতে হয়।

সদর হাসপাতালের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কথা হয় অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সামিয়া নাজনিনের সঙ্গে। তিনি জানান, তিন বছর বয়সে তার রোগটি ধরা পড়ে। তার বড় বোন অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাহার পপির বয়স যখন নয় বছর, তখন তিনি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হন। নিয়মিত রক্ত নেয়া এবং অন্যান্য চিকিৎসা বাবদ প্রতি মাসে দুই বোনের পেছনে ৪৫-৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে রক্ত নিতে হয় এবং ঢাকায় চিকিৎসা নিতে হয়। এ পর্যন্ত তাদের দুই বোনের চিকিৎসায় ৩৪-৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাদের এ রোগ বাবা-মায়ের মাধ্যমেই তাদের শরীরে এসেছে। বাবা-মা উভয়েই এ রোগ বহন করে এসেছিলেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মুকন্দপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ে আনোয়ারা খাতুনও (২১) থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। ১ ডিসেম্বর সদর হাসপাতালে রক্ত নিতে এসেছেন তার মা আশুরা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে।

আশুরা খাতুন জানান, আট বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে মেয়ের। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে তাদের পরিবার। এরই মধ্যে স্বামী আব্দুল কুদ্দুস স্ট্রোকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। প্রতি মাসে মেয়ের রক্তসহ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে তারা এখন ঋণে জর্জরিত।

চিকিৎসকরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত নারী-পুরুষ যখন বিয়ে করবেন তখন তাদের চারজন সন্তানের মধ্যে অন্তত একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী হতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের দুটি সন্তানই থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়ে জন্ম নিতে পারে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক যত বাড়বে, রোগীর সংখ্যাও তত বাড়বে। যারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক তাদের মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। আক্রান্তদের শিশুকাল থেকেই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন রক্তশূন্যতা দেখা দেবে, মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে দেখাবে। চেহারায় হলুদ ভাব থাকবে অর্থাৎ জন্ডিস থাকবে। চেহারার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে, মুখ চ্যাপ্টা, কপাল, থুতনি, সামনের দাঁত একটু প্রমিনেন্ট থাকে। যেটাকে থ্যালাসেমিয়া ফেসিস বলা হয়। শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, প্লিহা (পেটের বাম পাশে ওপরের দিকে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা লসিকাতন্ত্র ও রক্ত সংবহন তন্ত্রের অংশ) বড় হয়ে যায়। রক্তশূন্যতার জন্য ঘন ঘন রক্ত দেয়ার কারণে শরীরে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যায়। হার্ট, লিভার ও বিভিন্ন এন্ড্রোক্রাইন অর্গানের মধ্যে অতিরিক্ত আয়রন জমতে থাকে। এর ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক বয়োবৃদ্ধ ও সেকেন্ডারি সেক্স ক্যারেক্টার প্রকাশে ব্যাঘাত ঘটে। এক সময় ডায়াবেটিস, হার্ট ফেইলিউর ও লিভার সিরোসিসের মতো জটিল সমস্যাও হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. কাজী আরিফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া রোগটি পরিবার থেকে পরিবারে বিস্তার করে। এটি কখনই নিরাময়যোগ্য নয়। আক্রান্ত রোগী যতদিন বেঁচে থাকবে চিকিৎসার পাশাপাশি রক্ত দিয়ে যেতে হয়। এটি এমন একটি নীরব ঘাতক ব্যাধি, যে পরিবারে হবে, সেই পরিবারই সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। তবে রোগটি উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় খুব বেশি বিস্তার ঘটাচ্ছে। রোগটির স্থায়ী চিকিৎসা হলো বোনম্যারো (অস্থিমজ্জা) প্রতিস্থাপন। ব্যয়বহুল এ চিকিৎসা যদি কেউ করতে পারে তাহলে দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকা হয়তো সম্ভব। এছাড়া রোগটি যেহেতু জেনেটিক, তাই বিয়ের সময় পরিবারের সতর্ক থাকা দরকার। ছেলে-মেয়ের শরীরে থ্যালাসেমিয়া রোগ পরীক্ষা করা জরুরি। তবে ছেলে বা মেয়ের মধ্যে একজনের শরীরে রোগটি থাকলে তাদের বিয়ে দেয়া যাবে। উভয়ই যদি রোগ বহন করে তাহলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম রোগটি বহন করতে হবে।’

আরও