আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ সুদে রেপো পাই। ব্যবসায়ীদের আমরা সাড়ে ১১ থেকে ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেই। আমার সামনে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা বলবেন, এ সুদহার বেশি। তবে আমি বলব, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই ইচ্ছামতো সুদ আরোপ করার সুযোগ নেই। আমরা ১০ থেকে ১১ শতাংশ সুদে ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনছি। আমানত নিচ্ছি ৮ শতাংশ সুদে। এসব পরিসংখ্যান থেকে বলতে পারি, ব্যাংকার হিসেবে আমরা বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ঋণের সুদহার নির্ধারণ করতে পারছি। এখানে অনৈতিক কোনো চর্চা করার সুযোগ নেই।
আমরা সাধারণভাবে দেখছি দেশে ডলারের দর ১২২ টাকা। কিন্তু এটিও নির্ধারিত নয়। প্রতিদিন এ দর বাজারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হচ্ছে। গত ১৫ বছর স্বপ্ন ছিল, আমরা বাজারভিত্তিক বিনিময় হার দেখব। অর্থনীতির অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সে স্বপ্ন আজ বাস্তবায়ন হয়েছে। এ মুহূর্তে বছরে আমাদের ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি ও ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসছে। আর প্রতি মাসে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ধরলে আমদানি ব্যয় হবে ৭০ বিলিয়ন ডলার। তার মানে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা খুবই ভালো অবস্থানে রয়েছি।
আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এখন প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন ডলার বেচাকেনা হচ্ছে। গত কয়েক বছরের বিচারে এটিও স্বপ্নের মতো। গভর্নর স্যারের নেতৃত্বে অসাধারণ এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১৯ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি এখন উদ্বৃত্তের ধারায় চলে এসেছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও এখন দেড় বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত আছে।
রিজার্ভ মানি এখন প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আগের সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ড নিজেরাই কিনত। এখন আর তা হচ্ছে না। ফলে রিজার্ভ মানি স্বাভাবিক গতিতে আসছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হলেও প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য এ একটি চ্যালেঞ্জ। আমি হিসাব করে দেখেছি, প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ‘ম্যাট্রেস মানি’ বা তোষকের নিচে চলে গেছে। অর্থাৎ, এ পরিমাণ অর্থ বাজারে সার্কুলেট হচ্ছে না। এ অর্থ বাজারে আনার জন্য ব্যাংকগুলোর উদ্যোগ নেয়া দরকার। ব্যাংকগুলো যদি বিকাশের মতো গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, তাহলে এ অর্থ অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসা সম্ভব।
আমাদের মধ্যে প্রবণতা আছে, গরিবের আমানত নিয়ে আসার কিন্তু গরিবকে কিছু না দেয়ার। এ প্রবণতা থেকেও ব্যাংকারদের বেরোতে হবে। এজন্য ডিজিটাল লোন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, সিটি ব্যাংক ডিজিটাল ন্যানো লোন চালু করেছে। এর মধ্যে আমরা ৬৭ লাখ মানুষকে ন্যানো লোন দিয়েছি। এ গ্রাহকদের কাউকে আমি চোখে দেখিনি। ন্যানো লোনে আমরা ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। গড়ে একজন ঋণ নিয়েছে মাত্র ৪ হাজার টাকা। অথচ পাঁচ বছরের এ ঋণে আমাদের খেলাপির হার মাত্র ২ শতাংশ। করপোরেট বা বড় গ্রাহকদের এ ঋণ দেয়া হলে আদায় করতে ঘাম ছুটে যেত। অনেক বড় গ্রাহক ঋণ নিয়ে বিএমডব্লিউ কেনে, মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠান করে। কিন্তু একবারও চিন্তা করে না, এটা একটা গরিব দেশের মানুষের টাকা।
একটা কথা বলা হয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধি এখন স্লো। আমি বলব, এটি কেবলই একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড। জাতীয় নির্বাচন হওয়ার পর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে হাওয়া লাগবে। গড়পড়তা একটি তথ্য দেয়া হয়, দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র ৬ শতাংশ, এটি গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু এটিও দেখতে হবে, সিটি ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ২১ শতাংশ হয়েছে। ডাচ্-বাংলা, ব্র্যাক, ইবিএল, ট্রাস্টসহ ভালো ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধিও ভালো। দুর্বল ১০-১২টি ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বন্ধ থাকলেও অর্থনীতির খুব বেশি সমস্যা হবে না।
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরেছে। পর্ষদ সভায় এখন ঋণ বিক্রি বন্ধ। এ কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কম। ব্যাংক খাতে অনেক ধরনের শৃঙ্খলা এসেছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাংক খাতে অনেক বেশি সুপারভিশন হচ্ছে। আশা করছি, বেসরকারি খাতে ঋণের গতি বাড়ার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। আমরা কৃষি ও সিএসএমই খাতে আরো ঋণ দিতে চাই। আর বিদেশী ব্যাংকগুলোও এখন বাংলাদেশকে নিয়ে ইতিবাচক ভাবছে। বৈশ্বিক জায়ান্ট ব্যাংক জেপি মরগান গত সপ্তাহে বাংলাদেশের ১১টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীকে সিঙ্গাপুরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ সাধারণত মাশরেক ব্যাংক ও কমার্জ ব্যাংক থেকে ক্রেডিট লাইন পায়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ওই সম্মেলনে গিয়ে দেখলাম, জেপি মরগানের মূল ফোকাস এখন বাংলাদেশ। তারা বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্রেডিট লাইন দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। বিশ্ববাসী এখনো আমাদের বিশ্বাস করে, কারণ আমরা একদিনের জন্যও তাদের কাছে খেলাপি হইনি। আমি বলব, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন রানওয়েতে আছে, এটি অবশ্যই উড়বে।