বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশী ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪১১ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ১৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২৮ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল, যা বিদেশী ঋণের দায় ও পরিশোধ সূচির চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশী ঋণ পরিশোধ বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ কোটি ডলারে। পরের অর্থবছরে তা আরো বেড়ে হয় ২৫১ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ঋণ পরিশোধ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে ৩৪৮ কোটি ডলারে পৌঁছে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ৪১১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘ফরেক্স মার্কেট অ্যান্ড রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট রিপোর্ট ফর ফিসক্যাল ইয়ার ২০২৪-২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মূলত সরকারের বিদেশী দায় পরিশোধে ‘নেশনস ওয়ালেট’ বা রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে। আমদানি ব্যয়, জ্বালানি বিল ও বেসরকারি খাতের বৈদেশিক দায়ের পাশাপাশি এখন সরকারি ঋণ পরিশোধেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। আগে যেখানে বাংলাদেশের এ ঋণের বড় অংশ ছিল স্বল্পসুদের কনসেশনাল ঋণ, এখন তুলনামূলক বেশি সুদে নেয়া ঋণের অংশও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এক দশক ধরে নেয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ পর্যায়ে প্রবেশ করায় এখন চাপ দৃশ্যমান হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি এবং নতুন ঋণের তুলনায় পুরনো ঋণের কিস্তি দ্রুত বাড়ায় বৈদেশিক খাতে চাপ বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৫ সালে যখন বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলো, তখন থেকেই আস্তে আস্তে কনসেশন বা সহজ শর্তের ঋণ কমে আসা শুরু করেছে এবং নন-কনসেশনাল বা কঠিন শর্তের ঋণ বাড়ছে। আগে যেখানে দশমিক ৭ শতাংশ সুদে দীর্ঘ ৩০ বছরের জন্য ঋণ পাওয়া যেত, সেই সুবিধা এখন আর নেই। এখন প্রায় সব ঋণের ক্ষেত্রেই সুদের হার বাড়ছে এবং গ্রেস পিরিয়ড ও রিপেমেন্ট পিরিয়ড কমছে।’
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় এখন সুদের পাশাপাশি আসল পরিশোধও শুরু হয়েছে। রূপপুরের মতো কয়েকটি বড় প্রকল্প এখন রিপেমেন্ট পর্যায়ে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড আগের তুলনায় ছোট এবং পরিশোধকালও কমে এসেছে। তাদের মতে, এ পরিস্থিতিতে কোন খাতে ঋণ নেয়া হচ্ছে, সেই ঋণ থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে কিনা এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকছে কিনা এসব বিষয়ে সতর্ক নজরদারি প্রয়োজন। রিজার্ভের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে তা দেশের আমদানি সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের এ চাপের বড় অংশই এসেছে সরকারি খাতের ঋণ থেকে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সেতু, রেল ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে নেয়া বিভিন্ন ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী কয়েক বছর এ চাপ আরো বাড়তে পারে। কারণ ২০১৫ সালের পর থেকে দ্রুত বেড়ে যাওয়া বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ এখন পরিশোধ পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এরই মধ্যে বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতার ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ঋণ নিয়ে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দক্ষতা ও রিটার্ন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে ডেট সার্ভিসিং চাপ আরো বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও রফতানি আয় শক্তিশালী করার সুপারিশও রয়েছে তাদের।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ এখন ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। যদিও এখনো বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না, তবে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী না হলে আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক খাতে চাপ আরো বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের। তবে নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতাকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্যে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি হিসাব পদ্ধতি, সময়সীমা ও অন্তর্ভুক্তির ভিন্নতার কারণে এ তফাৎ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া সার্বভৌম বৈদেশিক দায় পরিশোধকে গুরুত্ব দিয়ে ‘সভারেইন ডেট সার্ভিসিং’ হিসাব প্রকাশ করে।
অন্যদিকে ইআরডি বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি, ছাড়, আসল ও সুদ পরিশোধসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সরকারের সামগ্রিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ করে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিশোধের সময়, ডলার রূপান্তর হার, কিছু স্বল্পমেয়াদি দায় বা সার্ভিস চার্জ অন্তর্ভুক্তির পার্থক্যের কারণে এ ব্যবধান তৈরি হয়। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যই নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং তা এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।