খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় মসজিদের পুকুর খনন ও ঘাট নির্মাণের নামে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে উপজেলার গোমতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সদস্য ও মধ্য গড়গড়িয়া পাড়া জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গড়গড়িয়া পাড়া জামে মসজিদের পুকুর খননের কথা বলে ‘সারা দেশে পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্প’
থেকে অর্থ বরাদ্দ নেয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পে বাবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তির জমি মসজিদের জমি হিসেবে দেখানো হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমিতেই পুকুর খনন শুরু করা হয়। পরবর্তী সময় প্রকল্পে মিথ্যা তথ্য দেয়ার বিষয়টি জনসম্মুখে চলে এলে বন্ধ করে দেয়া হয় খননকাজ।
জানা যায়, সারা দেশে পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত বছরের ডিসেম্বরে মধ্য গড়গড়িয়া পাড়া জামে মসজিদের পুকুর খনন ও ঘাট নির্মাণকাজের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) থেকে বরাদ্দ আসে। ওই পুকুরটি খননে ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৫ টাকা এবং ঘাট নির্মাণের জন্য ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৯ টাকা চুক্তিমূল্যে বরাদ্দ দেয়া হয়। খননকাজের জন্য ‘ফারহানা আকতার’
ও ঘাট নির্মাণে ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’
নামে পৃথক দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমতি পায়। ঘাট নির্মাণ এখনো শুরু না হলেও পুকুর খনন প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
বাবুল হোসেনের ছেলে গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আমার বাবা বাবুল হোসেন দেশের বাইরে থাকেন। জায়গাটি মূলত উনার নামেই। সরকারি প্রকল্পটি বরাদ্দ হওয়ার পর স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি আমার কাছে আসেন। তারা প্রকল্পটি আমাদের জায়গায় বাস্তবায়নের অনুমতি চান এবং এর বিপরীতে ৯-১০ লাখ টাকা দাবি করেন আমাদের কাছে। আমরা তাতে রাজি হইনি। তবু তারা আমাদের জায়গায় পুকুর খননকাজ শুরু করেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় জায়গাটি মসজিদের নামে লিখে দেয়ার জন্য আমাদের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য আমাদের কাছে এমন অযৌক্তিক আবদার করছেন। রাজি না হওয়ায় আমাদের নানাভাবে হুমকিও দেয়া হচ্ছে। আমাদের জায়গা মসজিদের নামে লিখে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রয়োজনে আমরা মসজিদ পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে মামলা করব।’
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি গোলাম হোসেন বলেন, ‘আমি বয়োবৃদ্ধ একজন নিরীহ মানুষ। সভাপতি হিসেবে আমি কেবল নামেই আছি, সবকিছু হয় এলাকার মেম্বার ও চেয়ারম্যানের নির্দেশে। তারাই সব জানেন।’
অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। এসব চেয়ারম্যান ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাজ।’
তবে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে গোমতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন লিটন বলেন, ‘বিষয়টি আমি মীমাংসার চেষ্টা করেছি মাত্র। বাবুল মিয়ার ছেলে কিবরিয়ার কাছে পুকুরের জায়গাটি মসজিদের নামে লিখে দেয়ার অনুরোধ করেছিলাম। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।’
খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান বলেন, ‘অভিযোগটি তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মসজিদের পুকুর খননের কথা বলে প্রকল্পটি আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এদিকে অভিযোগ পাওয়ায় পর পরই পুকুরের খননকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া খননকাজের কোনো বিল দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান। ফলে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও কাজের বিল পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন কাজের উপঠিকাদার মাটিরাঙ্গা পৌরসভার কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী।
তিনি বলেন, ‘অনিয়ম করলে করেছে মসজিদ পরিচালনা কমিটি কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এখানে আমাদের কোনো অপরাধ নেই। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আমাদের যেখানে খনন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, আমরা সেখানেই খনন করেছি। অথচ বিনা অপরাধে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’