দোকান ও অটোর দখলে সার্ভিস লেন বাস দাঁড়ায় রাস্তার মাঝে

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে লেগে থাকে যানজট

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দূরপাল্লা ও লোকাল যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হলেও নানা অনিয়মে ম্লান হচ্ছে এর সুফল।

নিয়ম ভেঙে লোকাল বাসের চালকরা সরাসরি মূল লেনে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন। যাত্রীরাও জেনেবুঝে উঁচু বিভাজক টপকে চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। এর সঙ্গে সার্ভিস লেনের মুখে অটোরিকশার বিশৃঙ্খল জটলা ও হকারদের অবৈধ ফুটপাত দখলের কারণে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফলে ভালো উদ্যোগটি ভেস্তে গিয়ে মহাসড়কে দিন দিন বাড়ছে জনভোগান্তি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা।

সরেজমিনে মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায় অনিয়মের নানা চিত্র। সাভার পৌরসভার শিমুলতলা এলাকায় ঢাকাগামী সরাসরি লেনে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে দূরপাল্লার যানবাহন। এর মধ্যেই কালিয়াকৈর-মিরপুর রুটের ‘রাজধানী পরিবহন’-এর একটি বাস মূল সড়কে হুট করে থেমে যায়। চালক সরাসরি লেনের মাঝখানেই যাত্রী ওঠানামা শুরু করেন। বাসে ওঠার জন্য আগে থেকেই কয়েকজন যাত্রী উঁচু সড়ক বিভাজক টপকে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাসটি থামার পর যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাতে ওঠেন এবং কয়েকজন নেমে যান।

এর ঠিক পেছনেই এসে থামে চন্দ্রা-সদরঘাট রুটের ‘সাভার পরিবহন’-এর আরেকটি বাস। তারাও একই কায়দায় সরাসরি লেনে যাত্রী তোলে। নবীনগরগামী লেনেও একই বিপজ্জনক চিত্র চোখে পড়ে। আইন অমান্য করে লোকাল বাসগুলো সরাসরি লেনে থামছে। আর যাত্রীরাও ঝুঁকি নিয়ে উঁচু সড়ক বিভাজক টপকে কিংবা ফাঁক গলে যাতায়াত করছেন।

একই অবস্থা দেখা গেছে হেমায়েতপুর, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড, ধামরাই থানা স্ট্যান্ড, ঢুলিভিটা ও কালামপুর এলাকায়। বাসগুলো সার্ভিস লেন ব্যবহার না করে মাঝরাস্তায় থামছে। ফলে উঁচু বিভাজক পার হতে অনেকে নিজেদের তৈরি ইটের সিঁড়ি ব্যবহার করছেন। কেউ আবার ঝুঁকি নিয়ে দুই বিভাজকের ফাঁক দিয়ে গলে বের হচ্ছেন। তথ্যমতে, গত এক বছরে শুধু সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেই এভাবে বিভাজক পার হতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। এছাড়া বিভাজকের শুরু ও শেষের মুখে বাস থামিয়ে পুরো লেন আটকে দেয়া হচ্ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

সাভার বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ব্যাংকার সানজিদা কান্তার সঙ্গে। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে প্রতিদিন সাভারে যাতায়াত করেন। সানজিদা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাসগুলো সবসময় সরাসরি লেনে থামিয়ে আমাদের নামিয়ে দেয়। এরপর উঁচু ডিভাইডার টপকে অফিসে যেতে হয়। একজন নারীর পক্ষে কি এত উঁচু ডিভাইডার টপকানো সম্ভব? বাসগুলো ভেতর দিয়ে গেলে আমাদের এ কষ্ট হতো না।’

সাভারের মজিদপুর এলাকার বাসিন্দা রাফি মনে করেন পরিকল্পনারও কিছু ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পাকিজা থেকে রেডিও কলোনি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার টানা বিভাজক দেয়া ঠিক হয়নি। সার্ভিস লেনের মুখগুলোতে অটোরিকশা জ্যাম তৈরি করে রাখে। ডিভাইডারের দৈর্ঘ্য ছোট হলে বাসগুলো যাত্রী নামিয়ে দ্রুত মূল সড়কে ফিরতে পারত। মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমত।’

তবে এসব অনিয়ম বন্ধে পুলিশ এবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ঢাকা জেলা উত্তর ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক) জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি নজরে এসেছে। আগামী এক সপ্তাহ চালক ও যাত্রীদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে। পরিবহন মালিকদেরও সার্ভিস লেন ব্যবহারের কড়া নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। এর পরও যারা আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা দেয়া হবে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সাধারণ নাগরিক ও পরিবহন শ্রমিক—উভয়কেই আইন মেনে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’

এদিকে চালকরা দুষছেন সার্ভিস লেনের অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখলকে। হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের সার্ভিস লেনে দেখা যায় ২০-২৫টি প্রাইভেট কার পার্ক করে রাখা। আরিচাগামী লেনে আরো ১০-১৫টি লেগুনা ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে পথ আটকে রেখেছে। সাভার ও নবীনগরেও একই অবস্থা। সার্ভিস লেনের বড় অংশ চলে গেছে অবৈধ ফুটপাতের দখলে। দুপুরের পর হকারদের কারণে সার্ভিস লেনে হাঁটার জায়গাও থাকে না।

ইতিহাস পরিবহনের চালক ইব্রাহিম বলেন, ‘লোকাল লেনে একবার ঢুকলে বের হতে আধ ঘণ্টার বেশি লেগে যায়। তার ওপর উল্টো পথে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল চলে। যাত্রীরাও দেরি হবে দেখে সার্ভিস লেনে যেতে চান না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা মেইন রোডেই বাস থামাই।’

আরও