ঝিনাইদহে কৃষকদের নিজস্ব বীজ উৎপাদন কমেছে। একসময় জেলাটিতে কৃষকের ঘরে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা চালের নিচে সংরক্ষিত থাকত পরের মৌসুমের বীজ। সে বীজে ফিরত নতুন ফসল ও নতুন আশা। কিন্তু সে চিত্র আজ বদলেছে। ঘরের বীজের জায়গা দখল করেছে বাজারের রঙিন প্যাকেট। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বীজ সরবরাহের ঘাটতি ও বেসরকারি কোম্পানির আধিপত্যের ফলে কৃষকরা ক্রমেই বাজারনির্ভর হয়ে পড়ছেন। এতে স্থানীয় বিচিত্র ফসল ও দেশী জাতের বীজ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। এসব ফসলের মধ্যে স্থানীয় জাতের ধান ও ডাল অন্যতম।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের ৪০-৪৫টি জাত, ডালের ২২-২৫টি ও সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ হতো। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে ৬০-৬৫টিতে, ডালের জাত ৩২-৩৫টিতে ও সবজির জাত ৫৫-৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনেক জাত হারিয়ে যেতে বসেছে। ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল, দিঘাসহ অনেক স্থানীয় ধানের জাত এখন বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে দেশী খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা ও তিল।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ ও হাইব্রিড বীজের মাত্র ১ শতাংশ সরবরাহ করতে পারে। বাকি বড় চাহিদা পূরণ করছে বিভিন্ন বেসরকারি বীজ কোম্পানি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ বছর আগেও জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষকই কোম্পানির কাছ থেকে চড়া দামে বীজ কিনে চাষাবাদ করছেন। ফলে চাষীর নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের প্রবণতা কমে গিয়ে বাজারনির্ভরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বীজ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছে হাইব্রিডের অতিরিক্ত বিস্তার। উচ্চ ফলনের আশায় কৃষকরা হাইব্রিডের দিকে ঝুঁকলেও এ বীজের ক্ষেত্রে পরবর্তী মৌসুমে একই মানের বীজ ঘরে সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে প্রতি মৌসুমে কৃষকদের নতুন বীজের প্রয়োজন হয়। এতে কৃষকের নিজের জমির বীজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে বাজারনির্ভরতা বাড়ছে।
শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেন চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। তিনি জানান, সরকারি বীজের জন্য বিএডিসির অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরে কোনো বীজ পাননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন তিনি। একই উপজেলার কাচেরকোল গ্রামের মসলেম উদ্দিন বলেন, ‘আমি বাজার থেকে বীজ কিনে চাষ করেছি। কিন্তু বীজে অঙ্কুরোদগম হয়নি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে নিজের জমির ভালো ধান আলাদা করে মাটির মটকা কিংবা গোলায় সংরক্ষণ করা হতো। সে বীজে ভালো ফসলের আশা দেখতাম। কিন্তু এখন বাজারের ভেজাল বীজে সে নিশ্চয়তা নেই। তার পরও ঘরে বীজ না থাকায় প্রতি মৌসুমে আমাদের বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজের আধিপত্য থাকলেও মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। চড়া দামে বীজ কিনেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। কারো অভিযোগ বীজের অঙ্কুরোদগম কম, আবার কারো অভিযোগ প্যাকেটের নামের সঙ্গে মাঠের ফসলের কোনো মিল নেই।
শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা ও মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল জানান, বীজ নষ্ট হলে শুধু বীজের দামই নয়, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের পুরো খরচই নষ্ট হয়। কালীগঞ্জের কৃষক বসির আহমেদ জানান, নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেক কমে যায়। কিন্তু এখন বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশটুকুও কমে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রাজস্ব প্রকল্প, পার্টনার প্রোগ্রাম ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মতো কিছু উদ্যোগ রয়েছে। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলেও এর আওতা সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষকই এ সুবিধার বাইরে থাকছেন।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সঠিক নিয়মে শুকিয়ে ও রোগমুক্ত রেখে বীজ সংরক্ষণ করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে ভালো জাতের বীজ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় জাতের অনেক বীজ আমাদের কৃষির ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে জড়িত। কৃষকের ঘরে বীজ সংরক্ষণের অভ্যাস ফিরিয়ে আনা গেলে হারিয়ে যেতে বসা ফসল ও চাষের বৈচিত্র ফিরিয়ে আনা যাবে।’