ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে আপনি শিপিং লাইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেখান থেকে কৃষি খাতে যুক্ত হলেন কীভাবে?
আমি মাল্টিমোড গ্রুপের অধীনে গ্লোবাল শিপিং লাইনে কাজ করতাম। কৃষিতে আসাটা ছিল অনেকটা আকস্মিক ও মনের তাগিদে। ১৯৯৫ সালের এক রাতে ডাচ (নেদারল্যান্ডস) অ্যাম্বাসাডরের সঙ্গে সাইমন গ্রুট নামে এক ভদ্রলোক আমাদের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু সাহেবের বাড়িতে নৈশভোজে আসেন। সেখানে সাইমন গ্রুট একটি কথা বলেছিলেন যা আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তিনি বলেছিলেন, কৃষির মৌলিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বীজ। অর্থাৎ সার বা কীটনাশক যা-ই থাকুক না কেন, ভালো বীজ ছাড়া কৃষি সফল হওয়া অসম্ভব। তখন বাংলাদেশে খাদ্যের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। সে অভাব পূরণে উন্নত বীজের গুরুত্ব আমি সেদিনই প্রথম অনুভব করি। নৈশভোজের পরদিন ভোরে ওনাকে নিয়ে কারওয়ান বাজারে যাই। ছয় ফুট লম্বা সেই ডাচ বৃদ্ধকে দেখলাম গভীর আগ্রহে বাজার থেকে চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স আর মিষ্টিকুমড়া কিনছেন। হোটেলে ফিরে তিনি ছোট ছুরি দিয়ে সবজি কেটে বীজের মান পরীক্ষা শুরু করলেন। বীজের প্রতি তার একাগ্রতা দেখে অভিভূত হই। একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশে পার্টনার খুঁজলে আমরা আগ্রহ দেখাই। এভাবেই যৌথ উদ্যোগে ‘ইস্ট ওয়েস্ট সিড বাংলাদেশ লিমিটেড’ (বর্তমানে লাল তীর) যাত্রা শুরু করে। একই সঙ্গে শিপিং থেকে কৃষি ও বীজের জগতে আমার পথচলা শুরু হয়।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও আমদানিনির্ভরতা কমানো নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ খাতের একজন অংশীজন হিসেবে আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বর্তমান সরকারের ৩১ দফার এজেন্ডায় কৃষিকে যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই। তবে কৃষির একদম মৌলিক জায়গাগুলোতে হাত দিতে না পারলে প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। আমদানিনির্ভরতা কমাতে চাইলে সবার আগে কৃষককে একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে। কৃষকরা অনেক প্রতিকূলতা ও অবহেলার মাঝেও কেবল টিকে থাকার তাগিদে কৃষিতে যুক্ত আছেন। ২০২০-২১ সালের করোনা মহামারীর সময় বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকরা রোদ-বৃষ্টি বা মহামারীর ভয় উপেক্ষা করে প্রতিদিন মাঠে কাজ করেছেন। ফলে সারা পৃথিবী খাদ্য সংকটে পড়লেও আমরা পড়িনি। শুধু কৃষকের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, তাদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে এ পেশায় তারা শান্তিতে আছেন এবং তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত। কৃষক কৃষিতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে তবেই উৎপাদন বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব।"
বর্তমান বাজার বাস্তবতায় আপনার প্রতিষ্ঠান লাল তীরের প্রধান ফোকাস বা গুরুত্বের জায়গাগুলো কী কী?
বীজ দিয়েই লাল তীরের যাত্রা শুরু। প্রথম থেকেই আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—প্রত্যেক কৃষকের হাতে মানসম্মত ও ভালো বীজ পৌঁছে দেয়া। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা যদি ১০০টি বীজ বপন করি এবং তার মধ্যে ৩০টি অঙ্কুরিত না হয়, তবে শুরুতেই আমরা ৩০টি গাছ এবং সেই পরিমাণ ফলন হারালাম। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শতভাগ বীজের অঙ্কুরোদ্গম নিশ্চিত করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
বীজ খাতের পাশাপাশি আমরা লাইভস্টকের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় পরিসরে কাজ করছি। বাংলাদেশে পুষ্টিসম্মত দুধ ও মাংসের এখনো ব্যাপক অভাব রয়েছে। তাই বীজের মতোই আমরা উন্নত মানের ‘সিমেন’ সরবরাহ করছি। যাতে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত জাতের বাছুর জন্ম নেয়। উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতই আমাদের মূল ফোকাস।
দেশের বর্তমান বীজবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?
গত ১৫ বছরে"বাংলাদেশের বীজবাজারের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক বৈষম্য। ভারত থেকে যে কেউ চাইলে লাইসেন্স ও কোয়ারেন্টাইন নিয়ম মেনে বীজ আমদানি করতে পারে। কিন্তু আমরা চাইলেই ভারতে বীজ রফতানি করতে পারি না। ভারত তাদের কোয়ারেন্টাইন রেগুলেশনে নির্দিষ্ট কিছু দেশের তালিকা করে রেখেছে, যেখানে অধিকাংশ সবজির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম নেই। মাত্র তিন-চারটি ফসলের ক্ষেত্রে তারা আমাদের সুযোগ দিয়েছে। এ নীতিগত বাধার কারণে আমাদের স্থানীয় শিল্পের রফতানি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজারে মানহীন ও অপরীক্ষিত বীজের প্রবেশ। অনেক সময় কৃষক কম দামে বীজ কিনে প্রতারিত হন। তৃতীয়ত, নকল বীজের দৌরাত্ম্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। নামি কোম্পানির প্যাকেট হুবহু নকল করে নিম্নমানের বীজ বিক্রি করা হচ্ছে, যা সাধারণ কৃষকের পক্ষে ধরা অসম্ভব। যদি আমরা নকলবাজদের ধরতেও পারি, প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান অত্যন্ত নগণ্য। নকল ও মানহীন বীজ নিয়ন্ত্রণ করা সৎ ব্যবসায়ী ও সরকার উভয় পক্ষের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ১৫ বছরে বীজের অবাধ আমদানির যে বিষয়টি গড়ে উঠেছে, অংশীজন হিসেবে আপনারা কি এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো অভিযোগ বা দাবি জানাননি?
‘বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে এ বৈষম্য ও আমদানির বিষয়গুলো নিয়ে দেনদরবার করেছি। কিন্তু আমদানিকারকদের কাগজপত্র ঠিক থাকলে অনেক সময় চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে একটি সমস্যা হলো দেশে সরকার বদল হলেও বেসরকারি খাতকে আপন করে নেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়নি। আমরা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে একটি উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন করলাম; কিন্তু সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কখনই সেটির প্রচার বা ক্যাম্পেইন করবে না। আজ থেকে ৪০ বছর আগে বিএডিসি হয়তো বীজের একমাত্র উৎস ছিল, কিন্তু এখন বেসরকারি খাত অনেক এগিয়েছে। এসব আচরণের কারণে দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”বর্তমানে বাংলাদেশের বীজের বাজারে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা অভাবনীয়। সবজিবীজের ৯৯ শতাংশ, ভুট্টার ১০০, পাটের প্রায় ৮৫ ও আলুবীজের ৯০ শতাংশই এখন বেসরকারি খাত সরবরাহ করছে। এই যে বিশাল সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, একে কাজে লাগানোর দায়িত্ব সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগেরও।
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে লাল তীরের বিশেষ কোনো উদ্যোগ আছে কি? নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আপনারা কীভাবে এগোচ্ছেন?
লাল তীর শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রথম গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি বীজ কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে। শুরুতে আমাদের সঙ্গে চারজন ডাচ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, যাদের হাত ধরে আমরা হাইব্রিড বীজের প্রযুক্তি আয়ত্ত করি। বর্তমানে নিজস্ব দক্ষ ব্রিডার রয়েছেন, যার ফলে এ পর্যন্ত আমরা ৮০টিরও বেশি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও নিবন্ধন করতে পেরেছি। আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো ফলের আকার ও রঙ এক রাখা, ফলন বাড়ানো এবং কোনো রাসায়নিক ছাড়াই বীজের মাধ্যমে ফসলের ‘শেল্ফ লাইফ’ বৃদ্ধি করা।
আমাদের বড় সাফল্য হাইব্রিড পেঁয়াজ। যেখানে দেশে প্রতি একরে মাত্র তিন-চার টন পেঁয়াজ হতো, আমাদের উদ্ভাবিত জাতের মাধ্যমে তা ১৪ টনে উন্নীত হয়েছে। নয় বছরের গবেষণা ও তিন বছরের ট্রায়ালের পর এ সাফল্য এসেছে। বীজের দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কৃষকরা যখন দেখেন তাদের ফলন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, তখন তারা নিজেরাই হন্যে হয়ে এ বীজ খোঁজেন। বর্তমানে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশেষ করে লোনা পানির অনুপ্রবেশ রুখতে রামপালে আমাদের একটি ডেডিকেটেড গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে কাজ করছি।
বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজের বাজারের সম্ভাবনা কেমন? বিশেষ করে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনে আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?
সবজি উৎপাদনে আমরা অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও রফতানি হচ্ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক অন্তত ২২৫ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন, যা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন আরো বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি উন্নত বীজ। বাস্তবতা হচ্ছে, জলবায়ুগত কারণে সব ধরনের বীজ বাংলাদেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। যেমন বাঁধাকপি, গাজর বা বিশেষ জাতের ধনিয়ার বীজের জন্য যে দীর্ঘ সময় ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, তা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। তাই কিছু বীজ আমাদের আমদানি করতেই হবে।
তবে আশার কথা, হাইব্রিড ফুলকপির মতো কঠিন জাতের বীজে বড় সাফল্য অর্জন করেছে লাল তীর। এছাড়া করলা, উচ্ছে, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, ঢেঁড়স ও মুলার মতো জনপ্রিয় সবজিগুলোর বীজ উৎপাদনে এখন অত্যন্ত দক্ষ। আমি অত্যন্ত আশাবাদী, দেশীয় উদ্ভাবন ও সক্ষমতা বাড়লে আমদানীকৃত বীজের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে।
আপনারা নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছেন ঠিকই, কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা এ উদ্ভাবন সম্পর্কে কীভাবে জানতে পারেন? তাদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
আমরা মূলত দুটি উপায়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। প্রথমত, আমাদের শক্তিশালী ‘আফটার সেলস সার্ভিস’ রয়েছে। নিয়মিত ‘মাঠ দিবস’ আয়োজন করি, যেখানে কৃষকদের হাতে-কলমে নতুন জাতের গুণাগুণ দেখানো হয়। দ্বিতীয়ত, আমরা ডিলারদের মাধ্যমে এবং সরাসরি কৃষকদের মাঝে তথ্যবহুল লিটারেচার বা নির্দেশিকা বিতরণ করি। এর মাধ্যমে তারা জানতে পারেন কোন বীজ কতক্ষণ ভেজাতে হবে বা কখন বপন করতে হবে। এছাড়া আমাদের একটি ডেডিকেটেড হটলাইন বা কল সেন্টার সার্ভিস আছে। কোনো কৃষক চাষাবাদে সমস্যায় পড়লে বা নতুন জাত সম্পর্কে জানতে চাইলে সরাসরি আমাদের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান নিতে পারেন।
বীজের নতুন বাজার বা আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে আগামী পাঁচ বছরের জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?
দেশে উৎপাদিত অধিকাংশ সবজিবীজেরই আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ওমান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ বেশকিছু দেশে নিয়মিত বীজ রফতানি করছে লাল তীর। এমনকি কারিগরি বাধা সত্ত্বেও ভারতের বর্ডার এলাকাগুলোতে আমাদের বীজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের রুচি ও চাহিদা ভিন্ন। আমেরিকা বা ইউরোপের মূলধারার মানুষ আমাদের মতো চিচিঙ্গা বা করলা চেনে না; তারা করলাকে ‘বিটার মেলন’ হিসেবে জানলেও আমাদের স্বাদের সঙ্গে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু টমেটো, মরিচ, ঢেঁড়স, শসা বা মিষ্টিকুমড়া—এগুলো বৈশ্বিক পণ্য। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য গবেষণার মাধ্যমে বীজের এমন জাত তৈরি করা, যা ইউরোপ ও আমেরিকার মূলধারার বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশ একদিন নেদারল্যান্ডসের পর্যায়ে যাবে। বর্তমানে চীন বা ইতালির বীজের ওপর উন্নত দেশগুলোতে ‘কোটা’ ব্যবস্থা আছে, বাংলাদেশের জন্য বাজার উন্মুক্ত। আমরা চাই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছতে, যেখানে বাংলাদেশের বীজের চাহিদাও এত বাড়বে যে আন্তর্জাতিক বাজারে কোটা ইম্পোজ করার প্রয়োজন হবে। তবে এজন্য সরকারি পর্যায়ে কিছু নীতিসহায়তা, বিশেষ করে দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি স্থাপন প্রয়োজন। বর্তমানে বীজের শুধু রোগবালাই পরীক্ষা হয়, কিন্তু বিশ্ববাজারে বীজের পূর্ণাঙ্গ ‘হেলথ চেকআপ’ রিপোর্ট চাওয়া হয়। সরকারি উদ্যোগে এমন একটি ল্যাব প্রয়োজন।
সরকারি নীতিমালা বা বীজ আইনের ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার প্রয়োজন মনে করেন কিনা?
আমাদের বীজ আইন যেটা আছে সেটাকে ব্যবসাবান্ধব, কৃষিবান্ধব ও জনবান্ধব করতে হবে। এটা এত বেশি ওপেন ছিল যে কার বীজ, কোথায় যাচ্ছে সেটা বোঝা যেত না। প্রায় ১০-১৫ বছর আগে আমরা বীজের নিবন্ধন নিয়ে কথা বললাম। সরকার ও বেসরকারি খাত মিলেই এ ফরম্যাট দাঁড় করিয়েছে। আমাদের খুব বিখ্যাত একটা করলার বীজ আছে, নাম ‘টিয়া করলা’। এটা ভারতের কিছু কিছু রাজ্যেও বিখ্যাত। আমরা ভালোর জন্যই এটা চেয়েছিলাম। আমরা নীতিমালার জন্য আবেদন করেও ঝুলে আছি। আশা করি, নতুন সরকার কৃষি খাতকে সহজতর করতে পদক্ষেপ নেবে।
তরুণদের আকৃষ্টের জন্য কৃষি খাতের সম্ভাবনা কতটুকু?
দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, অথচ কৃষিতে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষিত তরুণদের এ খাতে যুক্ত করতে হলে প্রথমত, কৃষকের উৎপাদন মূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। গত ২০-৩০ বছরে তথ্যপ্রযুক্তির কারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে। কৃষক এখন মোবাইলেই ঢাকার বাজারের দাম জেনে যাচ্ছেন এবং লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে পারছেন। কিন্তু পথে পথে চাঁদাবাজি ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে। তৃতীয়ত, আমাদের জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আলুর বাজারের বর্তমান অস্থিরতাই এর প্রমাণ। আমাদের কোনো রোডম্যাপ নেই যে এ বছর কতটুকু জমিতে আলু হবে বা কতটুকু চাহিদা থাকবে। অথচ আমেরিকায় পেঁয়াজ চাষের মাসখানেক আগেই সব জমি বুকিং হয়ে যায় এবং সরকার জানে কতটুকু ফলন আসবে। আমাদের দেশেও এমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে দক্ষ কৃষি বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষকের অভাব নেই। এ দুই জগতের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বিত ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ গঠন সময়ের দাবি। এ পরিষদই মূলত কৃষির একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করে দেবে। একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কৃষিকে এগিয়ে নিতে হবে।
এ পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে কি তরুণরা কৃষিতে আরো বেশি আকৃষ্ট হবে?
একজন তরুণ যখন মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেবে, তখন তার সচ্ছল জীবনটাকে নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অনেক তরুণ তার বাবার জমি বিক্রি করে বিদেশে যাচ্ছে। কারণ সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত নয়। আমাদের যদি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে, তবে তারা বুঝবে বিদেশে যাওয়ার চেয়ে দেশেই ভালো থাকা সম্ভব। বর্তমানে অনেক উন্নত দেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে; এ সুযোগে আমরা যদি তরুণদের নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে পারি, তবে তারা দেশেই থেকে যাবে। তবে জমি সীমিত থাকায় উন্নত দেশের মতো বিশাল খামারের স্বপ্ন দেখা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কঠিন। কিন্তু উন্নত বীজ, সঠিক প্রযুক্তি ও সরকারি নীতিসহায়তার মাধ্যমে ‘স্মার্ট কৃষি’ নিশ্চিত করতে পারি। যেখানে কৃষক অল্প জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে ধনী না হলেও অন্তত একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সচ্ছল জীবন অতিবাহিত করতে পারবেন। এ নিশ্চয়তা দিতে পারলেই কৃষিতে শিক্ষিত তরুণদের জোয়ার আসবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বিশাল খামার বা ভীষণ রকমের ধনী কৃষক পরিবারের স্বপ্ন কি আমরা বাংলাদেশে দেখতে পারি?
পশ্চিমা দেশগুলোতে বড় বড় খামারি বা কৃষিভিত্তিক ধনী পরিবার দেখা যায়, যেমন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ছিলেন সফল বাদাম ব্যবসায়ী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে হাজার একরের খামার করা হয়তো কঠিন, তবে আমরা উচ্চবিত্ত বা ‘এলিট’ কৃষকশ্রেণীর কথা অবশ্যই ভাবতে পারি। দেশে প্রান্তিক কৃষকের পাশাপাশি পাঁচ একর বা ২০ একর জমির মালিকদের যদি আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করা যায়, তারা আদর্শ বা ‘মডেল ফার্মার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। পাকিস্তান আমলে বা স্বাধীনতার পর আমরা ঈশ্বরদীর বাদশা মিয়ার মতো অনেক ‘ফেমাস’ কৃষক দেখেছি, যাদের দেখে পুরো এলাকার মানুষ অনুপ্রাণিত হতো। লাল তীরের পক্ষ থেকে এখনো এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করি। সরকার যদি জাতীয় পর্যায়ে আবারো এমন ‘আদর্শ কৃষক’ তৈরির প্রথা বা পুরস্কার চালু করে এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেয়, তবে এ খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বাজার থেকে মানহীন বা নকল বীজ সরাতে এবং বীজের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে সরকার বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ আছে কি?
বীজের মান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘ইস্টা’। তারা বিশেষ ‘অরেঞ্জ সার্টিফিকেট’ প্রদান করে। এটি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট বীজের গুণগত মান বিশ্বমানের। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন কোনো ইস্টা স্বীকৃত ল্যাবরেটরি ছিল না। লাল তীর ২০১২ সালে এ স্বীকৃতির জন্য কাজ শুরু করে এবং কঠিন পরীক্ষা ও প্রটোকল মেনে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ল্যাব হিসেবে ‘ইস্টা’ স্বীকৃতি লাভ করে। এ স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ তারা একই বীজের স্যাম্পল বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ল্যাবে পাঠিয়ে ফলাফল যাচাই করে। সামান্যতম পার্থক্য হলেও তারা স্বীকৃতি দেয় না। বর্তমানে আমরা ‘অরেঞ্জ ও ব্লু’ উভয় ধরনের সার্টিফিকেট ইস্যু করার সক্ষমতা রাখি। কোনো কোম্পানি চাইলে তাদের পাঠানো স্যাম্পল পরীক্ষা করে আমরা এ সার্টিফিকেট দিতে পারি। আমাদের ইন্সপেক্টর সরাসরি কোম্পানির গুদামে গিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করবেন, লট সিল করে আসবেন এবং ল্যাবে পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলেই কেবল ওই সিল করা ব্যাগ রফতানিযোগ্য হয়। বিএডিসিসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থাকেও উৎসাহিত করছি এ স্বীকৃতি নেয়ার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, দেশে যদি এমন আরো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি গড়ে ওঠে, তবে নকল ও মানহীন বীজের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোর ভূমিকা এবং এ খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
খাদ্যনিরাপত্তার আধুনিক সংজ্ঞা এখন আর কেবল পেট ভরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন সুষম ও পুষ্টিসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা। বেসরকারি খাত বর্তমানে সবজি, ভুট্টা ও আলুবীজের প্রায় ১০০ শতাংশ সরবরাহ করে এ পুষ্টি নিরাপত্তায় বিশাল ভূমিকা রাখছে। তবে আমাদের প্রাণিজ আমিষ, দুধ ও তেলের চাহিদাও নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য কেবল বিএআরসির মতো রেগুলেটরি বডি থাকলেই হবে না, কৃষিকে বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে এগিয়ে নিতে কৃষি গ্রুপকে নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘এগ্রিকালচার কাউন্সিল’ প্রয়োজন।
এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের কী ধরনের নীতিসহায়তা, প্রণোদনা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন?
আমি মনে করি, বাংলাদেশের বীজ শিল্পের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাকে এখনো যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। সার বা অন্যান্য কৃষি উপকরণ নিয়ে যতটা আলোচনা ও নীতি নির্ধারণ হয়, বীজ নিয়ে ততটা হয় না। অথচ বীজই হলো উৎপাদনের মূল ভিত্তি। এ খাতের উন্নয়নের জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে কোনো সরাসরি ভর্তুকি চায় না; আমরা চাই সুদূরপ্রসারী নীতিসহায়তা ও রফতানি প্রণোদনা। একসময় বীজে ২০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেন্টিভ বা নগদ সহায়তা ছিল, যা বর্তমানে কমিয়ে ৮ শতাংশে আনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা শূন্যে নামিয়ে আনার কথা শোনা যাচ্ছে। এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে। তৈরি পোশাক খাত আজ যেখানে পৌঁছেছে, তার পেছনে ছিল শুরু থেকেই সরকারের বিশেষ নীতিসহায়তা ও এলসি সুবিধা। আমরা যদি বীজ শিল্পকে গার্মেন্টসের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চাই এবং একে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপান্তর করতে চাই, তবে এখনই এ খাতে বড় ধরনের প্রণোদনা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। পরিকল্পনা ও সরকারি সমর্থন পেলে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বীজ শিল্প ১২ বছরের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের সমান বা তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।