সর্বশেষ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের ফলে বড় একটি অংশ চলে গেছে অবকাঠামোর দখলে। ফলে পাঁচ একরের সেই পার্ক এখন সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে এক একরের কিছু বেশি জায়গায়, অনেকটা ‘পকেট গার্ডেন’-এর মতো।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার শহরে যেখানে সবুজ ও উন্মুক্ত জায়গার প্রয়োজন দিন দিন বাড়ছে, সেখানে বিদ্যমান পার্ক ছোট করে ফেলায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি পার্কের আয়তন কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং নগর উন্নয়নের নামে ঢাকার সবুজ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার প্রতিফলন।
পান্থকুঞ্জের ইতিহাসও কিছুটা ব্যতিক্রমী। যে জায়গায় পার্কটি গড়ে উঠেছে, সেটি একসময় ছিল জলাভূমি। পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগে জলাভূমি ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হয় বাণিজ্যিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো। তারই অংশ পাঁচ একরের একটি পার্ক। অর্থাৎ একসময় জলাভূমি হারিয়ে যে নগর অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল, সে এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য কিছুটা ধরে রাখতে পার্কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। কিন্তু গত দুই দশকে এর পরিসরও ক্রমান্বয়ে কমেছে।
সম্প্রতি সরজমিনে পার্কটিতে গিয়ে দেখা যায়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের কার্যক্রম চলছে। নির্মাণসামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতি রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এর বড় একটি অংশ। এতে পার্কের ব্যবহারযোগ্য উন্মুক্ত জায়গা আরো সংকুচিত হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পার্কের কতটুকু জায়গা আগের অবস্থায় ফিরবে, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পান্থকুঞ্জের জায়গা কমতে কমতে আজকের অবস্থায় এসেছে। পাবলিক টয়লেট, বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন স্থাপনার জন্য পার্কের জমি ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বশেষ এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণ সে সংকটকে করেছে আরো প্রকট।
পান্থকুঞ্জ পার্কের ইতিহাস জানতে কথা হয় স্থপতি ইকবাল হাবিবের সঙ্গে। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা আজিমপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিল তার যাতায়াত। সে সময়ের দৃশ্যপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার হয়ে উত্তর দিকে যে সড়কটি চলে গেছে, সেটির নাম ছিল ময়মনসিংহ সড়ক। নাম থেকেই বোঝা যায়, এ সড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলে যাতায়াত করা হতো। পাশাপাশি ছিল রেলপথ। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন থেকে সেটি বুয়েটের সামনে দিয়ে বর্তমান কাঁটাবন ও হাতিরপুল হয়ে তেজগাঁও রেলস্টেশনে গিয়ে মিলত। হাতিরপুল মূলত ছিল একটি রেলসেতু—ওপরে রেল চলাচল ও নিচ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করত।’
ইকবাল হাবিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সড়ক ও রেল সড়কের মাঝের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল নিচু জমি ও খালের সমাহার। সেই নিম্নাঞ্চলেরই একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ভরাট করে পান্থকুঞ্জ পার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বর্তমান কাঁঠালবাগান, ভূতের গলি ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পুরো এলাকাই তখন নিচু ভূমি ছিল। এখনো এসব এলাকা ঢালু এবং স্থানীয়ভাবে ‘ঢাল’ নামে পরিচিত। বর্ষা কিংবা ভারি বৃষ্টির সময় এসব এলাকায় পানি জমত। নিচু এলাকা হওয়ায় সেই পানি রেল সড়ক পার হয়ে সহজেই তৎকালীন বেগুনবাড়ি খাল, অর্থাৎ বর্তমান হাতিরঝিলে চলে যেতে পারত না। ফলে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশন বরাবরই একটি জটিল বিষয় ছিল।’
ইকবাল হাবিব আরো বলেন, ‘পান্থপথ দিয়ে প্রবাহিত খাল পরিবর্তন করে বক্স কালভার্ট নির্মাণ এবং এর মাধ্যমে তরল ও কঠিন বর্জ্য নিষ্কাশনের যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার প্রেক্ষাপটেই ময়মনসিংহ সড়ক ও রেল সড়ক দিয়ে ঘেরা ত্রিভুজাকৃতির এ জলাধার ভরাট করে পান্থকুঞ্জ পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে জলাভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় না নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী।’
পান্থকুঞ্জ পার্ক তৈরির পেছনে শুধু সৌন্দর্যবর্ধন বা নগরবাসীর বিনোদনের বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে সড়ক রক্ষার বিষয়টিও যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ খোন্দকার মোহাম্মদ আনসার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এরশাদ সরকারের সময়ে পান্থকুঞ্জ পার্ক নির্মাণ করা হয়। শুরুর দিকে এলাকাটি ছিল জলাধার। বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে পানির স্রোতের ধাক্কা এসে পড়ত ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে। সড়কটিকে বন্যার ভাঙন থেকে রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগে পান্থকুঞ্জের পুরো এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এর একটি অংশ পার্কে রূপান্তর করা হয় এবং আরেকটি অংশ বাণিজ্যিক প্লটে পরিণত করে রাজউক বিক্রি করে দেয়।’
স্থানীয়দের মতে, পান্থকুঞ্জ পার্কের ওপর বড় ধরনের প্রথম আঘাত আসে ২০০৭-০৮ সালের দিকে। ওই সময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন পার্কের একটি অংশে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) বা বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ করে। পরবর্তী সময়ে পার্কের ভেতরে নির্মাণ করা হয় পাবলিক টয়লেটও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণের পর থেকেই পার্কটি ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। একসময় যে পার্কে মানুষ হাঁটতে, বসতে কিংবা অবসর কাটাতে আসত, সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থাপনা যুক্ত হওয়ায় পরিবেশ ও ব্যবহার দুদিক থেকেই সংকট তৈরি হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৮ সালে পান্থকুঞ্জ পার্ক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়ে কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে সে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র এর কারণ হিসেবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান।
পান্থকুঞ্জ পার্কে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের পর পরই পরিবেশকর্মীরা আন্দোলনে নামেন। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষার বিষয়ে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু সে রায় উপেক্ষা করে পার্কের ভেতরে এসটিএস নির্মাণ করা হয়। এখন আবার পার্কের বড় একটি অংশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের মাধ্যমে দখল করা হচ্ছে।’
ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরো জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পান্থকুঞ্জ পার্কে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। তখন থেকেই তারা আন্দোলন করে আসছেন। এরপর আসে অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় আন্দোলনকারীরা দেড়শ দিনেরও বেশি সময় পার্কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এখন আবার সরকার পরিবর্তন হয়ে বিএনপি সরকার এসেছে। কিন্তু সরকার বদলালেও পার্কের দখলদারত্বের চিত্র বদলায়নি।
পান্থকুঞ্জ পার্ক উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির নগর পরিকল্পনাবিদ মো. নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পার্কটি নিয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নগর পরিকল্পনা বিভাগে নেই।’