প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী

সভায় ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে কেউ ভাইরাল হবে আর সরকার চুপ করে বসে থাকবে, তা হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস না হলেও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হলে তারও বিচার হতে হবে। এ কারণে সাইবার আইন সংশোধনের কাজ চলছে। বিদ্যমান আইনেও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে

প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মূলধারার গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, এ ধরনের অপপ্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

আজ সিলেটে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে সিলেট শিক্ষা বোর্ড এবং সিলেট অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।

‘পরীক্ষা হোক নকলমুক্ত, শিক্ষার মান হোক উন্নত’ এবং ‘সুশিক্ষায় গড়ি দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস ভবনের মিলনায়তনে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট এ নীতিনির্ধারণী সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন।

সভায় ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে কেউ ভাইরাল হবে আর সরকার চুপ করে বসে থাকবে, তা হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস না হলেও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হলে তারও বিচার হতে হবে। এ কারণে সাইবার আইন সংশোধনের কাজ চলছে। বিদ্যমান আইনেও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।

নকল প্রতিরোধ আইন আধুনিকায়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ১৯৮০ সালের নকল প্রতিরোধ আইনকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের বিষয়গুলো যুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোয় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ কর্মসূচি চালু হবে। এর আওতায় শিক্ষকদের ট্যাব ও ল্যাপটপ দেয়া হবে এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল বা কোনো ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে কেন্দ্রসচিব ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে দায় নিতে হবে। মন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে চলমান আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগ শুরু হবে। এতে গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়ে এক বা দুই শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালনার সমস্যা থাকবে না।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, জনস্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য বিবেচনায় নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। সরকারিকরণের আগে শিক্ষকদের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নেয়া হবে, যাতে তারা শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করেন। সরকারি কলেজে আত্তীকরণ থেকে বাদ পড়া শিক্ষকদের প্রশাসনিক জটিলতাও দ্রুত দূর করা হবে। শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দালালি বা ঘুষের কোনো সুযোগ থাকবে না। অনিয়ম পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, ব্যবস্থাপনা কমিটির রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ আরো শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য সরকারি বদলি ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে স্থানীয় আধিপত্য কমে।

শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর ভাতার অর্থ দ্রুত পরিশোধে সরকার এরই মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং ২ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছে বলেও জানান মন্ত্রী। তার আশা, আগামী ২ বছরের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের চাহিদা নেই এমন বিষয়ে নতুন করে অনার্স ও স্নাতকোত্তর কোর্স আর অনুমোদন দেয়া হবে না। উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের চাকরি না হারিয়ে অন্য পেশায় স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হবে। বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষা বোর্ডের কাজ শুধু প্রবেশপত্র বা ফল প্রকাশ নয়, শিক্ষার মান তদারকি করাও তাদের দায়িত্ব। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সিলেটের মতো প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা চালু করা হবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় শূন্য থাকা প্রায় ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করা হবে। প্রয়োজনে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস পাস করা যোগ্য শিক্ষার্থীদেরও এ নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মাদ্রাসা আলিয়ার তাজবিদ বিষয়ে বিদ্যমান জটিলতাও দূর করা হবে।

দীর্ঘ বক্তব্যে মন্ত্রী জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন। বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মো. সাদেকুর রহমান, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সচিব চৌধুরী মামুন আকবর, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিক্ষা বোর্ডের সেকশন কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ বেতারের ঘোষক রোহেনা সুলতানা। এছাড়া সিলেট বিভাগের চার জেলার বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ, মাদ্রাসার সুপার, শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও