তীব্র গরমে মানুষের সঙ্গে হাঁসফাঁস অবস্থা প্রাণিকুলেও। এর মধ্যে বেশি কষ্টে আছে চিড়িয়াখানার বন্দি প্রাণী। একে তো বন্দি জীবন, তার ওপর জীবনীশক্তি কমিয়ে দেয়া গরম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুক্ত জীবনে প্রাণী প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নেয়। কিন্তু খাঁচায় আবদ্ধ প্রাণীর সে সুযোগ নেই। এ কারণে তাপপ্রবাহ চলাকালীন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে প্রাণীর প্রতি বাড়তি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।
গতকাল দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা যায়, গরমের কারণে প্রাণীর কষ্ট হলেও বাড়তি কোনো যত্নের ব্যবস্থা করেনি কর্তৃপক্ষ। বরং অন্য সময় যে ব্যবস্থা থাকে বিভিন্ন অজুহাতে সেগুলোরও কিছু এখন বন্ধ রাখা হয়েছে।
চিড়িখানায় ঢোকার পথে চোখে পড়ে বানরের বড় খাঁচা। সেখানে পাশাপাশি দুটি চৌবাচ্চা রয়েছে। এ রকম তীব্র গরমেও একটি চৌবাচ্চায় পানি রয়েছে, অন্যটিতে নেই। গরমে স্বস্তি পেতে বানরদের একটি চৌবাচ্চাতেই গোসল করতে দেখা গেল। এছাড়া ভেতরের দিকে বানরপল্লীর বিভিন্ন প্রজাতির বানরের খাঁচা ঘুরে দেখা গেছে, গরমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি কোনো ব্যবস্থা রাখেনি কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি খাঁচায় একটি ছোট বেসিন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর পানি ময়লা। ফলে বানর ওই পানিতে গোসল করে গা শীতল করবে সে সুযোগ নেই।
সরজমিনে দেখা গেল, গরমের কারণে পুরো চিড়িয়াখানার প্রাণীর মধ্যে নির্জীব ভাব। এখানকার প্রধান আকর্ষণ বাঘ-সিংহকে তাদের কেবিন থেকে বের হতে দেখা গেল না। দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে বাঘ ও সিংহকে তারাও বের হতে দেখেননি।
অব্যবস্থাপনা দেখা গিয়েছে সিংহের খাঁচায়ও। সিংহের খাঁচার সামনে বিশাল চৌবাচ্চাটি পানিশূন্য। যদিও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, সিংহ পানিতে নামে না বলে পানিশূন্য রাখা হয়েছে চৌবাচ্চাটি। কিন্তু প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চৌবাচ্চায় পানি না রাখার জবাবদিহি থেকে বাঁচতে উদ্ভট কথা বলছে চিড়িখানা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, গরমে মানুষের মতোই কষ্ট হয় প্রাণিকুলের। প্রাণী যদি এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকে বা ছোটাছুটি না করে তাহলে বুঝতে হবে তাদের অস্বস্তি হচ্ছে, তারা স্বস্তি চাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গরমে মানুষের যেমন কষ্ট হয় প্রাণীরও হয়। আমার বাসায় বিড়াল আছে। সেগুলো টপ ফ্লোর থেকে নেমে সিঁড়িতে বুক লাগিয়ে বসে আছে। এর মানে হলো ওরা গরমে অস্থির হয়ে পড়েছে। চিড়িয়াখানার অবস্থাও তাই। এখানে যেসব প্রাণী থাকে, সেগুলোর বাড়তি যত্ন করতে হবে এই গরমে। পর্যাপ্ত পানি ও ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা ফ্যান লাগিয়ে বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের মুরগির খামার আছে, তারা কিন্তু এ কাজটা করে। মুরগির জন্য আলাদা বাতাসের ব্যবস্থা করে। ছায়ার ব্যবস্থা করে। তাহলে চিড়িয়াখানায় এ ব্যবস্থা থাকবে না কেন?’
তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে পাখি। গবেষকরা বলছেন, মানুষ ও বড় প্রাণীর চেয়ে অনেক পাতলা হয় পাখির চামড়া। তাপমাত্রা অল্প বাড়লেই পাখির জীবনধারণ ও বাচ্চা ফোটানো কষ্ট হয়ে যায়। চিড়িয়াখানায় বড় প্রাণীর মতো অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে পাখির খাঁচায়ও। ময়ূরের খাঁচায় সাতটি চৌবাচ্চা রয়েছে। সাতটিই গতকাল পানিশূন্য দেখা গেছে। ময়ূরের খাঁচায় একটি শেড আছে। গরম থেকে স্বস্তি পেতে তাদের শেডের নিচে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে পাখির জন্য আলাদা পানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাখি ডানা ঝাপটাতে চায়। কিন্তু গতকাল পাখির খাঁচায় নিয়মিত পানি দেয়া হয়নি এমনও দেখা গেছে। ম্যাগপাইয়ের খাঁচায় খাওয়ার পানি ছাড়া আলাদা কোনো পানির ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
গত রোজার ঈদের পরদিন চিড়িয়াখানায় পেলিক্যান পাখির খাঁচার সামনে গিয়ে দেখা গিয়েছিল, নিচে পুরো জায়গাজুড়ে পানি দেয়া। কিন্তু গতকাল দেখা যায়, অর্ধেক জায়গায় পানি আছে, বাকি অর্ধেক জায়গায় পানি নেই।
এমন তীব্র গরমের সময় পাখির জন্য নিয়মিত পানিও সরবরাহ না করাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজেদা বেগম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পাখি ও প্রাণীর জন্য এখন প্রচুর পানি প্রয়োজন। প্রচুর ছায়া ও গাছপালা দরকার। আমরা বিভিন্ন সময় চিড়িয়াখানায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, কর্তৃপক্ষ প্রাণীর প্রতি তেমন সদয় না। আমাদের বুঝতে হবে, যেসব প্রাণী খাঁচার বাইরে থাকে তারা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু যাদের আমরা খাঁচায় বন্দি করেছি, তারা আমাদের ওপর নির্ভরশীল। আমরা খেতে দিলে তারা খেতে পায়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের জন্য গরমে আরামের ব্যবস্থা করাও আমাদের দায়িত্ব।’
গরমে প্রাণীদের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে জানতে চাইলে জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. ওয়ালিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তীব্র গরমে মানুষ যে সমস্যায় পড়ে, প্রাণীরাও একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। প্রাণীদেরও হিট স্ট্রোক হয়, ডিসেন্ট্রি হয়, ডিহাইড্রেশন হয়ে থাকে। এসব থেকে তাদের বাঁচাতে পর্যাপ্ত পানি, ছায়ার প্রয়োজন।
গরমে পশু-পাখির জন্য পর্যাপ্ত পানি ও ছায়ার ব্যবস্থা নেই কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আমরা প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রেখেছি। তাদের জন্য ভেজা ছালা রেখেছি। তাদের যত্নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ সময় পশুর পানি বারবার পাল্টে দিচ্ছি। তাদের খাবারে স্যালাইন ও ভিটামিন দেয়া হচ্ছে। সর্বোপরি কথা হলো এ ধরনের অতিরিক্ত যত্ন না নিলে এসব প্রাণীকে বাঁচিয়েই রাখা যাবে না।’
বানর ও পেলিক্যানের খাঁচায় অর্ধেক অংশ পানিশূন্য রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বানর ও পাখির দুই অংশে পানি দিলে তারা পানি নষ্ট করে ফেলে। তাই এক অংশে পানি দেয়া হয়েছে আর বাকি অর্ধেক খালি রাখা হয়েছে।’
ময়ূরের খাঁচার সব চৌবাচ্চা খালি থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চৌবাচ্চার পানি লিক হয়ে গেছে। মেরামতের জন্য খালি রাখা হয়েছে।’
সিংহের খাঁচায় চৌবাচ্চায় পানি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিংহ পানিতে নামে না, তাই পানি দেয়া হয়নি। তবে বাঘ ও সিংহের খাঁচার ভেতের পানি দেয়া আছে।’