‘ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১’-এ আনা হচ্ছে ব্যাপক সংস্কার। বর্তমানে পরিচালকদের টানা ১২ বছর পর্যন্ত ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ রয়েছে, সেটি কমিয়ে করা হচ্ছে ছয় বছর। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে কমানো হবে পরিচালকের সংখ্যা এবং পর্ষদের অর্ধেক সদস্য হবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। তাদের নির্বাচনের জন্য একটি প্যানেল গঠন করা হবে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এ কথা জানিয়েছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি। এতে অংশ নিয়ে দেশের আর্থিক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নেয়া নানা দিক তুলে ধরেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং আইনেও মৌলিক সংস্কার আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে অ্যাসেট রিকভারি আইনও প্রণয়ন হচ্ছে। ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার-১৯৭২-এ। আমরা যতই সংস্কার করি না কেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যদি স্বাধীনতা না থাকে, এর লিডারশিপে যদি দুর্বলতা থাকে, তাহলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। আমরা দুর্বল লিডারশিপ দিয়ে শক্ত প্রতিষ্ঠান চালাতে পারব না। আবার শুধু শক্ত লিডার দিলেও হবে না, যদি প্রতিষ্ঠানের আইনগত শক্তি না থাকে। এ দুটি জায়গাতেই কাজ করতে হবে।’
আর্থিক খাতকে সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার দাবি জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও যেন বিষয়টি মাথায় রাখে। আর্থিক খাতকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যার ওপর রাজনৈতিক কিংবা আমলাতান্ত্রিক কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। বিগত সময়ে যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, সেটি আগামীতে কোনোভাবেই কোনোদিন যাতে ফিরে না আসে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসনও বাড়াতে হবে। ব্যাংক ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অ্যাক্টও নতুন করে প্রণয়ন করা হচ্ছে।’ ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন গভর্নর।
বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হতে হবে বলে দাবি তোলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও ব্যাংক খাতের জন্য দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। একটি গাড়িতে দুজন চালক থাকতে পারে না। অবশ্যই ব্যাংক খাতের চালক একজন হতে হবে।’ ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ গঠন, অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনসহ সংস্কারের নানা দিক তুলে ধরেন তিনি।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি। এর একটি হলো সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। অন্যটি ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যাতে ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক—তারা যেন এটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আরো সুদৃঢ়ভাবে আর্থিক খাতকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে আর্থিক খাতকে প্রতিষ্ঠিত করা এক-দুই বছরে সম্ভব নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এ ধারাবাহিকতার শুরুটা যাতে করে দিয়ে যেতে পারি, সেটিই ছিল আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো ছিল আমাদের প্রধান কাজ। আমরা জানি, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে খাদের কিনারায় ছিলাম। সেখান থেকে যদি দ্রুত ফেরত না আসতে পারি, তাহলে খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। গভর্নর হওয়ার পর আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম যে বৈঠকটি করি, সেটি দেশের কোনো ব্যাংকারের সঙ্গে ছিল না। সে বৈঠকটি ছিল আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে। বাংলাদেশের সঙ্গে ২০০-এর বেশি বিদেশী ব্যাংকের ব্যবসা রয়েছে। আমার প্রথম বৈঠক ছিল তাদের সঙ্গে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, নিউইয়র্ক, লন্ডনসহ সব জায়গার ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা জুমে সংযোগ স্থাপন করি। তাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ ছিল, যার যা ক্রেডিট লাইন (ঋণসীমা) আছে, সেটি আর কমাবেন না, যা আছে, সেটিই অব্যাহত রাখুন। আপনারা যদি দেখেন আমরা ভালো করছি, তাহলে আগের অবস্থায় ফেরত যাবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে ক্রেডিট লাইন আর কমাবেন না।’
প্রত্যেকটি সেন্ট (ডলারের ক্ষুদ্র একক) পরিশোধ করে দেয়া হবে, এমন প্রতিশ্রুতি ছিল জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘অতীতে বিদেশী ঋণ ও এলসি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে আমাদের সুনাম ছিল। কিন্তু আমরা দায়িত্ব নেয়ার সময় ২৫০ কোটি (আড়াই বিলিয়ন) ডলারের দায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বিদেশী ব্যাংকগুলোকে আমি বলেছিলাম, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আপনাদের সব দায় পরিশোধ করে শূন্যে নিয়ে আসব। বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা নাগরিকের কোনো দায় অপরিশোধিত রাখবে না। দেশের ব্যাংকগুলোকে আমরা বলেছিলাম, যেকোনো মূল্যে সবার আগে বিদেশীদের দায় পরিশোধ করে দিতে।’
রেমিট্যান্সের দিক থেকে অসম্ভব রকমের সহযোগিতা পাওয়া গেছে জানিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রফতানি আয়ও মোটামুটি ভালো ছিল। এ দুটি খাত থেকে যে ডলার পেয়েছি, সেটি আমরা ব্যবহার করতে পেরেছি। দ্রুততার সঙ্গে আমরা আড়াই বিলিয়ন ডলারের বকেয়া দায় পরিশোধ করে দিয়েছি। প্রত্যেকটি ব্যাংককে বলে দেয়া হয়েছিল, তারা যেন নিজেদের বকেয়া দায় পরিশোধ করে। সে দায় এস আলম কিংবা বেক্সিমকো, যারই হোক না কেন। বৈদেশিক কোনো দায় বকেয়া রাখা যাবে না। এ কারণে বিদেশী ব্যাংকগুলো এখন তাদের ক্রেডিট লিমিট আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে এনেছে। কিছু ব্যাংক লিমিট বাড়িয়েছে। এ পরিবর্তনটি আমাদের জন্য খুবই দরকার ছিল। তা না হলে শ্রীলংকা কিংবা পাকিস্তানের মতো আমাদেরও ট্রেড ফাইন্যান্স (আমদানি) বন্ধ হয়ে যেত।’
মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিনিময় হার অবশ্যই স্থিতিশীল করতে হতো উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘এক্ষেত্রে রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রির সুযোগ ছিল না। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, রিজার্ভ থেকে ১ ডলারও বিক্রি করব না। এক্ষেত্রেও আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। গত বছরের ১৪ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে একটি ডলারও বিক্রি করিনি। বরং বাজার থেকে দুই মাস ধরে ডলার কেনা হচ্ছে।’
বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার বিষয়েও কথা বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা এলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসেনি। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। বিরাজমান পরিস্থিতিতে এখনই কেউ বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়বে—এটি প্রত্যাশা করা কাল্পনিক। পাইপলাইনে আমরা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এক্ষেত্রে আরেকটু সময় লাগবে। আমাদেরকে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ব্যালান্স অব পেমেন্ট, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে আমরা এখন সারপ্লাস (উদ্বৃত্ত)। বৈদেশিক বাণিজ্যের এ তিনটি সূচকেই আমরা নেতিবাচক অবস্থানে ছিলাম। বাজারে তারল্য আসতে শুরু করেছে। আগামীতে আরো আসবে। দেশের পুঁজিবাজারও ঘুরে দাঁড়াবে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। আরো অনেক কমাতে হবে। প্রতি মাসেই যে কমবে এটি ধারণা করাও ভুল। দুই-তিন মাস কমবে, আবার কোনো মাসে বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক। আমি এখনো আশাবাদী যে চলতি অর্থবছরের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতির হার ৫-এর নিচে নেমে আসবে।’
সরকারের রাজস্ব আহরণের ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ কমছে না বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘এনবিআর সংস্কার ইস্যুতে সরকার বড় ধরনের ঝামেলা মোকাবেলা করেছে। এখন পরিস্থিতি অনুকূলে আছে। এনবিআরের ভেতরে যেসব গৃহশত্রু ছিল, তাদের দমন করা গেছে। তাদের স্বপদে বহাল রেখে সংস্থাটির সংস্কার করা সম্ভব ছিল না। এখন সুযোগ এসেছে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার।’
ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি থাকা অবস্থায় কোনো ব্যাংক ডিভিডেন্ড দিতে পারবে না জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘এটি এতদিন কাগজে-কলমে ছিল। কিন্তু আমরা শতভাগ বাস্তবায়ন করেছি। খেলাপি ঋণ গণনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডচর্চা শুরু হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত কারণে খেলাপি হয়ে যাওয়া উদ্যোক্তাদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির কাছে সাড়ে বারোশ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২৫০টি আবেদন এরই মধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। আমরা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল।’