উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রাম। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ এ অঞ্চলে রয়েছে ১৬টি নদ-নদী। নদীগুলোর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে ছোট-বড় চার শতাধিক চর। যেখানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বাস, যাদের প্রধান পেশা কৃষি। তবে দরিদ্র এ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়তই টিকে থাকতে হয় প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার খেলায়। বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছরই এসব চরের অনেক পরিবার হয় গৃহহীন। বিনষ্ট হয় তাদের আরাধ্য ফসল। আবার ভূমি হারিয়ে অনেকেই হয় নিঃস্ব। বন্যা-খরার সঙ্গে বাড়তি দুর্ভোগ যোগ করে শীতের তীব্রতা। এক সপ্তাহ ধরে জেলায় তাপমাত্রা ওঠানামা করছে ৯-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীতে বিভিন্ন রোগে ভুগছে চরের অনেক মানুষ। অথচ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এসব মানুষের ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নেয়ারও ব্যবস্থা নেই বেশির ভাগ চরাঞ্চলে। নতুন ভোগান্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে শীত বস্ত্রের সংকট।
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, শীত নিবারণের জন্য জেলার নয়টি উপজেলায় ৮০ হাজার কম্বলের চাহিদা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ২০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। শীতবস্ত্রের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এ টাকায় শীতবস্ত্র কিনে বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ।
চরের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। নদীভাঙন, বন্যা, খরা, শীতসহ নানা প্রতিকূলতার মাঝে জরাজীর্ণ অবস্থায় বসবাস করতে হয় তাদের। চিকিৎসাসেবা তো দূরের কথা, সাধারণ রোগের কোনো ওষুধ কেনার জন্য ফার্মেসিও তেমন একটা নেই। বছর কয়েক আগে চার শতাধিক চরাঞ্চলের মধ্যে ৫০টিতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে সরকার। এর মধ্যে নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে ছয়টি কমিউনিটি ক্লিনিক। যেগুলো চালু আছে সেগুলোয়ও মেলে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা ও কিছু ওষুধ। বাকি চরগুলোয় এ সুযোগও নেই। ফলে যেকোনো রোগের চিকিৎসা নিতে চরবাসীকে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে।
উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুসার চরের বাসিন্দা মতিয়ার রহমান জানান, পরিবারের ছয় সদস্য থাকলেও শীত নিবারণের প্রয়োজনীয় কাপড়ের অভাব রয়েছে। তাছাড়া এ বছর শীতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় খুব কষ্টে দিন কাটছে। দিনের বেলা শীত একটু কম থাকলেও সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল ১০-১১টা পর্যন্ত শীতে খুব কষ্ট হয়।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে বুধবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, এ মাসজুড়েই তাপমাত্রা নিম্নগামী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ঠাণ্ডায় মূলত শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বাড়ে। পাশাপাশি ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। এ সময় শিশুদের বিশেষ যত্ন নেয়া, কুসুম গরম পানি পান করানো এবং খাবারের আগে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুদের যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।
তবে কুড়িগ্রামের বেশির ভাগ চরেই নেই চিকিৎসাসেবার ন্যূনতম সুবিধা। এসব চরের মানুষকে চিকিৎসাসেবা নিতে নদীপথে দীর্ঘ ভোগান্তির পর পৌঁছতে হয় উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে। চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেউ অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসাও পান না তারা। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা দেয়া কষ্টসাধ্য।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার ঝুনকার চর কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রভাইডার মিজানুর রহমান জানান, শীতে চরাঞ্চলে সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ঝুনকার চর কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিকের চেয়ে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ক্লিনিকে আগে প্রতিদিন ৮-১০ জন রোগী এলেও বর্তমানে ১২-১৫ জন এসে ওষুধ নিয়ে যায়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার একটি চরের নাম কালির আলগা। চার বছর আগে জেগে ওঠা চরটিতে ৪০০ পরিবার বসবাস করলেও সেখানে নেই কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। একই চিত্র ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার বালাডোবা, মুসার চর, আটাশির চর, মাঝিয়ালির চর, মসলার চরসহ ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের অববাহিকার বেশির ভাগ চরাঞ্চলের।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে চার শতাধিক চরের মানুষ। কিন্তু তাদের জন্য আলাদা করে শীতবস্ত্র বরাদ্দ নেই। আমরা চাই চর মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা হলে চরবাসীর আলাদা হিসাব হবে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য সবকিছুই আলাদা বরাদ্দ থাকবে।’
সার্বিক বিষয়ে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা দেয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরও বিভিন্নভাবে চরের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে।’