এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও বসানো হচ্ছে কংক্রিটের পাইপ ও আরসিসি রিং। কোনো কোনো স্থানে কাজ শেষ হলেও রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। খোঁড়াখুঁড়ির ফলে কাদা-মাটি, ইট, খোয়া ও নির্মাণসামগ্রীতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে চলাচলের পথ। এতে সড়কে বের হলেই নাজেহাল হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এক অংশের কাজ শেষ না করেই অন্যত্র খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করায় একই এলাকার একাধিক সড়ক চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে থাকছে। কোথাও এ দুর্ভোগ চলছে দুই মাস, কোথাও ছয় মাস, আবার কোনো এলাকায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে।
সরজমিনে ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে মূল সড়ক ও গলি ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের বড় অংশজুড়ে মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী রাখার কারণে অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। খোঁড়া অংশের পাশে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড বা সেফটি নেট নেই। পথচারীদের চলাচলের জন্য অনেক জায়গায় দেয়াল ঘেঁষে সরু জায়গা রাখা হয়েছে। ফলে নারী, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এসব গর্তে বৃষ্টির পানি জমে এডিসসহ অন্যান্য মশার উপদ্রব বাড়ছে।
ধানমন্ডির ৮/এ লেকসাইড এলাকার স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই মাস ধরে ফুটপাত সংস্কারের কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকায় ফুটপাত দিয়ে হাঁটা কষ্টকর হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পথচারীদের মূল সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়কে কাজ শেষ হওয়ার পরও রাস্তা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। গ্রিন রোডের বিভিন্ন অংশে অন্য সেবা সংস্থার কাজ শেষে কোথাও শুধু মাটি ফেলে খোঁড়া অংশ ভরাট করে রাখা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পর এসব অংশ কাদায় পরিণত হচ্ছে এবং অসমতল সড়কে যান চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ধানমন্ডি ১৩/এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের এক পাশের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই অন্য পাশে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করা হয়েছে। এতে রাস্তার ব্যবহারযোগ্য অংশ আরো সরু হয়ে গেছে। কোনো কোনো সময় পুরো সড়ক বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রিকশা ও ভ্যান কোনো রকমে চলাচল করতে পারলেও পথচারীদের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ধানমন্ডির বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী সানজিদা বলেন, ‘দুই মাসের বেশি সময় ধরে রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। কাজ চললেও তা হচ্ছে খুব ধীরগতিতে। রাতে চলাচলকারীদের দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি বেশি। প্রতিদিনই যাতায়াতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ির কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।’
অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন অলিগলিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইত্যাদির মোড় ও রহিম ব্যাপারীর ঘাট এলাকায় কোথাও রাস্তা কেটে ড্রেনেজ লাইনের কাজ করা হচ্ছে, কোথাও রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী। খোঁড়া অংশের পাশে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় পথচারীদের সরু জায়গা দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই খোঁড়া মাটি ও কাদায় চলাচল আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইত্যাদির মোড় এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী রাফসান বলেন, ‘সামনের একটি রাস্তার কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় এক মাস আগে। সেটি শেষ না করেই আবার অন্য এলাকায় রাস্তা কাটা হচ্ছে। প্রায় ৫০০ মিটার এগিয়ে এক জায়গার কাজ বন্ধ রেখে অন্য জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি করা হচ্ছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে রাস্তা কেটে রাখা হলেও কবে কাজ শেষ হবে, তা কেউ জানেন না। রাস্তাটি ভালো অবস্থায় ছিল এবং আরো কয়েক বছর ব্যবহার করা যেত। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এখন যাতায়াত করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
মিরপুরেও উন্নয়নকাজের কারণে বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে তৈরি হয়েছে ভোগান্তি। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। চলাচলের পথের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজের কারণে পথচারীদের হেঁটে চলতে গিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। বড় গর্ত ও এবড়োখেবড়ো সড়কের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের তালতলা থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত ফুটপাতসহ ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়নের কাজ চলতি বছরের মার্চে শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মিরপুরের বিভিন্ন অলিগলিতেও চলছে ড্রেনেজ উন্নয়নের কাজ। দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ চলায় সড়কে নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটা ও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু চলাচলের দুর্ভোগ নয়, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পানি জমে তৈরি হচ্ছে আরেক সমস্যা। ড্রেনের কাজের জন্য খোলা গর্ত কিংবা অসম্পূর্ণ ড্রেনে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে। এতে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি ও দোকানের সামনে মাটি, ইট ও পাইপ পড়ে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
ধানমন্ডি ১৩/এ এলাকার বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে রাস্তা কাটা অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। রিকশা-ভ্যান কোনো রকমে চললেও হাঁটাচলাই কষ্টকর। বৃষ্টি হলে ড্রেনে পানি জমে যায়, এতে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি এলাকার কাজ শেষ না করেই অন্য এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করায় ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। এতে দীর্ঘদিনেও রাস্তা ও ফুটপাত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না। তাদের মতে, কাজগুলো পর্যায়ক্রমে এবং সমন্বিতভাবে করা হলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এসব বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-১ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুব আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে এ প্রতিবেদককে তিনি তার কার্যালয়ে এসে জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
তবে এসব ভোগান্তির বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৪০-৪৫ কিলোমিটার ড্রেনেজ উন্নয়নের কাজ চলছে। বৃষ্টির সময় সংস্কারকাজ করলে সড়ক বেশিদিন টেকসই হয় না। তাই বর্ষা শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে রাস্তা সংস্কারের কাজ পুরোদমে শুরু করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডি এলাকায় বিদ্যমান ড্রেনগুলোর আকার ও ধারণক্ষমতা ছোট হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ সমস্যা দূর করতে ড্রেনের আকার বাড়ানোর জন্য টেন্ডার আহ্বান করে কাজ করা হচ্ছে। এটি কোনো বিশেষ প্রকল্পের আওতায় নয়; সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে এসব কাজ করা হচ্ছে।’
তবে কাজ চলাকালে জনভোগান্তি তৈরি হওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন প্রধান প্রকৌশলী। তার ভাষায়, জনগণকে কষ্ট দেয়া সিটি করপোরেশনের উদ্দেশ্য নয়। অনেক সময় ঠিকাদারদের গাফিলতি কিংবা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। কাজের তদারকি বাড়ানো এবং নির্মাণস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রসিং পয়েন্টে কাঠ বা লোহার শিট দিয়ে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জোনের প্রকৌশলীদের সঙ্গেও কথা বলব।’
মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজের কারণে মাটি ও বর্জ্য জমে পানি আটকে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধান প্রকৌশলী। এসব কাজে সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিটি উন্নয়নকাজেরই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাটাই কাম্য। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সিটি করপোরেশন বা অন্য সংস্থাগুলো কাজ করার সময় জনভোগান্তির বিষয়টি একেবারেই বিবেচনায় নেয় না। উল্টো তারা কাজের দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে প্রকল্পকে টেনে লম্বা করে এবং এর মাধ্যমে প্রকল্পের বাজেট বা টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়ার একটি প্রচেষ্টা থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘উন্নত দেশে রাস্তার কোনো গর্তে পড়ে সাধারণ মানুষের হাত-পা ভাঙলে বা কোনো চোট পেলে প্রায় এক কোটি টাকার মতো ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো জরিমানা বা শাস্তির ব্যবস্থা নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে বাজেট দ্বিগুণ-তিনগুণ করে নিয়ে আসে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ার্ডভিত্তিক সিটি কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ মানুষের এ দুর্ভোগের কথা জানানোর বা অভিযোগ করারও কোনো জায়গা নেই।’