সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের হামলার প্রভাব পড়ছে ঢাকার আকাশপথের যোগাযোগেও। ঢাকা থেকে সৌদিগামী সরাসরি ফ্লাইট এবং সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট করা মোট ১০০টি ফ্লাইট গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৫ হাজার ৩৯৩ যাত্রী। তাদের একটি বড় অংশ ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ফ্লাইটের মধ্যে ৪১টি সরাসরি ও ৫৯টি ট্রানজিট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের সাতটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিটের সময় ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, সালামএয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজের সাতটি করে, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার দুটি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বরাতে গালফ বিজনেস জানায়, বিমানবন্দরের স্থাপনার নিরাপত্তা ও কার্যক্রম পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে বলে গত সোমবার জানায় দেশটির জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিএসিএ)।
পরিস্থিতির কারণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে। তবে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন।
এর আগে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে সব ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাইও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। এদিকে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) সামরিক তৎপরতা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বিবেচনায় সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোকে সতর্ক করেছে।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ছুটি কাটিয়ে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরা। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারলে চাকরি হারানো ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন অনেকে। তথ্য না পেয়ে বিমানবন্দরে চলে আসাও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এ কারণে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত না হয়ে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ১২ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় এয়ারলাইনসগুলোকে এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীদের হালনাগাদ তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। ফ্লাইটের সংশোধিত সময়, পুনরায় টিকিট বুকিং ও অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল ও খাবার দেয়া এবং বয়স্ক, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশও রয়েছে। প্রতিটি এয়ারলাইনসকে পর্যাপ্ত কর্মীসহ একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে বলা হয়েছে।
এদিকে রিয়াদের আকাশে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি আবাসিক ভবন ও একটি গাড়ি।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, রিয়াদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পেয়ে উদ্ধার ও নিরাপত্তা দল ঘটনাস্থলে যায়। সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থা এসপিএর বরাতে তিনি জানান, এতে একজন আরব নাগরিক আহত হয়েছেন। একটি আবাসিক ভবন ও একটি গাড়িরও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সৌদি আরবে গত এক সপ্তাহে হুথিদের হামলা বেড়েছে। এর মধ্যে শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হন। ধারাবাহিক এসব হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সৌদি আরবকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল ইসরায়েল। তবে দেশটির সামরিক সহায়তার প্রস্তাবে সম্মতি দেননি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করেও সফল হয়নি ইসরায়েল।