শিক্ষার্থী সংখ্যায় এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর প্রায় ৮ দশমিক ২০ শতাংশই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। সশরীরে ক্লাস করার বিষয়ে ছাড় দেয়া, পরীক্ষায় নকলের মতো ঘটনার কারণে প্রতিষ্ঠানটির গ্র্যাজুয়েটদের মান ও দক্ষতা নিয়ে চাকরিদাতা ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তারা বলছেন প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রে চাকরিক্ষেত্রে পদোন্নতি পেতে আগ্রহীদের কোনোমতে ডিগ্রি অর্জনের জায়গা হয়ে উঠেছে এবং বিপুলসংখ্যক সার্টিফিকেটসর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে উচ্চশিক্ষায় আরো বোঝা বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশকেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীরা সশরীরে কোনো ধরনের শ্রেণী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছাড়াই কেবল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সার্টিফিকেট অর্জনের সুযোগ পান। বাউবিতে ভর্তি হয়ে সহজে একটি সার্টিফিকেট অর্জনই অনেক শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েট হলেও তারা কতটা মানবসম্পদে পরিণত হচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সশরীরে শ্রেণী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করায় একজন শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবেই পিছিয়ে থাকছেন বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। এ যুগে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে যে সক্ষমতা প্রয়োজন সেটা তাদের শিক্ষাজীবনে গড়ে উঠছে না।
বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মূলত চাকরি ক্ষেত্রে পদোন্নতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হন। দেশের সরকারি চাকরিতে ডিগ্রিনির্ভর পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও বেসরকারি খাত মূলত দক্ষতানির্ভর। ফ্রেশারসদের ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট মুখ্য বিষয়, তবে মধ্যবয়সীদের ক্ষেত্রে মূল চাহিদা থাকে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি দেশে সার্টিফিকেটসর্বস্ব উচ্চশিক্ষা মূলত বোঝা বাড়াচ্ছে। বর্তমান চাকরির বাজারে মূল চাহিদা হলো দক্ষতার। সরকারের উচিত সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার তুলনায় দক্ষতানির্ভর শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেয়া।’
১৯৯২ সালে পাস হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন অনুযায়ী এটি একটি দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২-এর ধারা ৯-এ বলা হয়েছে, শিক্ষাদানের বিভিন্ন কার্যক্রম সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত হইবে এবং করেসপনডেন্স প্যাকেজ, ফিল্ম, ক্যাসেট, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বেতার অনুষ্ঠান, বক্তৃতা, টিউটোরিয়াল, আলোচনা, সেমিনার, পরিদর্শন, প্রদর্শন এবং ল্যাবরেটরি, ওয়ার্কশপ ও কৃষিজমিতে ব্যবহারিকসহ বাস্তব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অন্যান্য মাধ্যমে শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণ ওই পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হইবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘দূরশিক্ষণ পদ্ধতিকে অনেকটা স্বশিক্ষা পদ্ধতি বলা চলে। এখানে শিক্ষার্থী কতটা শিখবেন তা মূলত নির্ভর করে তার আগ্রহের ওপর। অনেক সময় সরাসরি পাঠদানেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ঘাটতি থাকে, সবার শেখার আগ্রহ একরকম হয় না। দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে পাঠদান করায় তাদের ক্ষেত্রে মনিটরিং নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাদের পরীক্ষাগুলো যেহেতু সশরীরে অনুষ্ঠিত হয় সেক্ষেত্রে তারা যদি যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করতে পারে এবং পাঠদান পদ্ধতি ও কারিকুলাম সময়োপযোগী রাখতে পারে তবে তারাও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।’
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব কোর্স রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি বিএড। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিএড কোর্সের এক শিক্ষার্থী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই ভর্তি হন কারণ এখানে ঘরে বসে ক্লাস করার সুযোগ রয়েছে। ক্লাসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কোর্সের মতো আমাদের এ কোর্সেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করেন না। অনেকে আবার ক্লাসে যোগদান মূলত অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিটরিং এবং নিয়ম-কানুনের শিথিলতায় এমন পরিস্থিতি। এখানে পাঠদানের সিলেবাস বা শিক্ষকদের ক্লাসের পড়ানোর ধরন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কোনো অংশেই খারাপ নয়। তবে নিয়ম-কানুনের শিথিলতার জন্যই মূলত ক্লাসে উপস্থিতি কম থাকে।’
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ডিএন কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্রে বিএ ও বিএসএস শেষ বর্ষের পরীক্ষায় প্রকাশ্যে নকলের ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা কেন্দ্রটি বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই বছর ২১ অক্টোবর নকলের অভিযোগে বাতিল করা হয় খোলাহাটি ডিগ্রি কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্রও। বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল অনেকটাই নিয়মিত ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা আলোচিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে।
ইউজিসি থেকে সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ২ হাজার ৬৯১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন। এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সবচেয়ে বেশি রয়েছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নকলে পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জালিয়াতিরও অভিযোগ রয়েছে। এর আগে এলএলবির সার্টিফিকেট জালিয়াতির ঘটনায় ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনার জেরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (স্নাতক) সম্পন্ন করা সব শিক্ষার্থীর ইন্টিমেশন কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসন এবং শিক্ষার মান নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) ড. দিল রওশন জান্নাত আরা নাজনীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। আমাদের দেশেও একই চিত্র। যে উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে আমরা আমাদের সিলেবাসকে আধুনিকায়ন করেছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছে এমনটি বলার সুযোগ নেই।’
শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি বিষয়ে ছাড়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল। আমরা ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিতে নম্বর রেখেছি এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছি। এছাড়া নকল রোধ এবং সার্টিফিকেট জালিয়াতি রোধেও আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, ‘উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেখানে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল। মানের বিষয়ে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এক্ষেত্রে শুধু উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা খাতেই মানের ঘাটতি রয়েছে। উন্মুক্তসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই উচিত মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দেয়া। এক্ষেত্রে তাদের যে সহযোগিতা প্রয়োজন, ইউজিসির পক্ষ থেকে তা প্রদানে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’