দেশের গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে শুকনো মৌসুমে নাব্য সংকটে নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে পণ্য পরিবহনে। নাব্য সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময় নৌ-রুটে ড্রেজিং করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তবে অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণে স্থায়ী সমাধান মিলছে না বলে মনে করেন নৌ-রুট ব্যবহারকারীরা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, আরিচা-কাজিরহাট, নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ী এবং পাটুরিয়া-কাউলিয়া নদীপথে ৩৭ লাখ ঘনমিটার বালি ড্রেজিং করেছে সরকারি এ সংস্থাটি। এতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
নৌ-রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের চালকরা বলছেন, প্রতিদিন রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া দিয়ে নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী নৌ-রুটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, কিন্তু নৌ-রুটের উত্তর দৌলতদিয়া, বেতালিয়া, কাজিরহাট, নাকালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ডুবোচর তৈরি হওয়ায় আটকে যাচ্ছে জাহাজ।
সরজমিন দেখা গেছে, নদীপথে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার খননকাজ হলেও বেশ কয়েকটি স্থানে চ্যানেল সরু রয়েছে। জেগে উঠেছে ডুবোচর। দৌলতদিয়ার মজিদ শেখের পাড়ায় অবস্থিত লঞ্চঘাট। এখান থেকে লঞ্চ ছেড়ে আধা কিলোমিটার পরই মিশেছে ফেরির চ্যানেলে। ওই চ্যানেলে একটি ফেরি ও লঞ্চ একসঙ্গে চলতে পারছে না। চ্যানেলটি শুধু দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়ায় যাওয়ার জন্য তৈরি। এ চ্যানেলে নদী পার হতে সময় লাগছে ৩৫-৪৫ মিনিট। এছাড়া দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাটের বিপরীতে সাত্তার মেম্বারপাড়া হয়ে একটি চ্যানেল পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে আসার জন্য তৈরি। এ চ্যানেল দিয়ে ফেরিগুলোর আসতে হচ্ছে অন্তত ছয় কিলোমিটার বেশি ঘুরে। কারণ নদীর মাঝে জেগে উঠেছে চর। আবার নাব্য সংকটের কারণে টানা দুই সপ্তাহ ধরে দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটের কাছে আটকে আছে অন্তত ২৫টি পণ্যবাহী জাহাজ।
দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটের বাসিন্দা নুরু উদ্দিন মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ঘাট এলাকায় ব্যবসা করি। মাঝে মাঝে পদ্মায় বড় বড় ড্রেজার দেখা যায়। খনন করতে খুব কম দেখা যায়। যাও দেখা যায়, তারা নদীর বালি আবার নদীতেই ফেলছে। যে কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও জলের টাকা জলেই যাচ্ছে, কমছে না মানুষের ভোগান্তি।’
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের অন্য বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, ‘পানির নিচ থেকে ড্রেজিং করে আবার পদ্মায় ফেলছে, এতে কোনো লাভ হচ্ছে না। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার খনন করলেও একশ্রেণীর কর্মকর্তার পকেট ভারী হচ্ছে কিনা বিষয়গুলো ভালোভাবে তদারক করা প্রয়োজন। না হলে এর সমাধান হবে না। শুধু দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করা হলেই এর সমাধান মিলতে পারে।’
এদিকে সম্প্রতি উত্তর দৌলতদিয়া সাত্তার মেম্বারপাড়ায় আটকে পড়ে সার, ভুট্টা, সিমেন্ট, পাথর, ক্লিংকারসহ বিভিন্ন পণ্য বহনকারী বেশ কয়েকটি জাহাজ। এমভি রুস্তম নামে একটি জাহাজের শ্রমিক আরিফ খান জানান, বাধ্য হয়ে জাহাজগুলো থেকে মালপত্র নামিয়ে ছোট ট্রলার ও বাল্কহেডে করে গন্তব্যে নেয়া হচ্ছে।
জাহাজ এমভি মায়ের দোয়ার মাস্টার সোয়াইব হোসেন জানান, প্রতিটি জাহাজ চলতে ১০-১৫ ফুট উচ্চতার পানি প্রয়োজন হলেও নদীতে রয়েছে ৮-১০ ফুট। এ কারণে আটকে যাচ্ছে জাহাজ। এছাড়া নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজি ও জাহাজ থেকে মালপত্র চুরির কারণেও লোকসানে পড়ছেন তারা।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ বেশ কয়েকটি শাখা নদীপথে কাজ করে। আমরা নদীর ওপর অর্থাৎ ঘাট মেরামত ও পন্টুন দেখভাল করি। বর্তমানে ঘাটে তেমন সমস্যা নেই। নৌ-রুটে সারা বছরই খননকাজ হয় সেটা আমরা জানি।’ তবে ড্রেজিংয়ের তথ্য নিতে চাইলে ওই সেকশনে কথা বলতে হবে বলে জানান সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম ।
পদ্মা ও যমুনা নদীর সমন্বয়ে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটের ঘাট সচল রাখা, নদীপথের ড্রেজিং ও পন্টুন মেরামত করে বিআইডব্লিউটিএ।
সংস্থাটির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন জানান, নৌ-রুটে বর্তমানে ১৭টি ফেরি চলাচল করছে। তবে নদীপথে ডুবোচরের কারণে ফেরিগুলোকে ছয়-সাত কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচও বাড়ছে।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর নৌপথ সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-পথটি পদ্মা ও যমুনার সমন্বয়ে চলমান। পদ্মা ও যমুনা দুটি নদীই বালি উৎপন্ন করে। একদিকে খনন করলে অন্যদিক স্বাভাবিকভাবেই ভরাট হয়ে যায়। এ মুহূর্তে নদীতে অন্তত ১০টি ড্রেজার দিয়ে খননকাজ চলছে। তৈরি হচ্ছে আরো একটি চ্যানেল। ওই চ্যানেলের খননকাজ শেষ হলে আর দুর্ভোগ থাকবে না। বিআইডব্লিউটিসির সঙ্গে আলোচনা করে নতুন চ্যানেলে ফেরি পরিচালনা করা হবে।’