মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় কেমিক্যালের দোকান-গোডাউন এখনো ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা

লাইসেন্স বন্ধ হলেও ব্যবসা চালু

নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের দোকান, গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। নিরাপদ স্থানে এসব ব্যবসা স্থানান্তরে নেয়া হয় একাধিক পরিকল্পনাও। কিন্তু বছরের পর বছর পেরোলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে ১০০-১৫০ মিটার দূরে মিটফোর্ড টাওয়ার। ভবনটির চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম তলায় মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল। সাইনবোর্ডে রয়েছে মেডিএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামও। একই ভবনের নিচতলায় সারি সারি দোকান। তাকজুড়ে বোতল, কৌটা ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেট। একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ‘পারফিউমারি অ্যান্ড ক্যামিকেলস’। অর্থাৎ একই ভবনের ওপরে হাসপাতাল আর নিচে রাসায়নিকের ব্যবসা।

শুধু মিটফোর্ড টাওয়ার নয়, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড, আরমানীটোলা, চকবাজার, বাবুবাজার ও লালবাগের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। সরু গলি-সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ ভবন। অনেক ভবনের নিচতলায় রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম। এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশেই বাসাবাড়ি, দোকান, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল ও হাসপাতাল। কোথাও ভবনের প্রবেশপথে, কোথাও আবার সড়কের পাশে রাখা হয়েছে রাসায়নিকের ড্রাম ও বিভিন্ন পণ্য।

নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের দোকান, গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। নিরাপদ স্থানে এসব ব্যবসা স্থানান্তরে নেয়া হয় একাধিক পরিকল্পনাও। কিন্তু বছরের পর বছর পেরোলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে এখনো রয়েছে রাসায়নিকের ব্যবসা ও মজুদ।

এমন পরিস্থিতিতে কোনো ভবনে আগুন লাগলে তা দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পুরান ঢাকার সরু সড়ক ও ঘনবসতির কারণে জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। রাসায়নিকের দোকান ও গুদামের পাশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড রোডে মিটফোর্ড টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের নিচতলার দোকানগুলোর সামনে রাখা হয়েছে রাসায়নিকসহ বিভিন্ন পণ্য। একটি দোকানের প্রবেশপথের সিঁড়ির পাশে কাঠের প্যালেটের ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে বস্তা। পাশের আরেকটি দোকানের শাটার বন্ধ থাকলেও সিঁড়ি ও ফুটপাত দিয়ে অবিরত চলাচল করছে ক্রেতা ও পথচারীরা। ভবনের সামনের সরু সড়ক দিয়ে গাঘেঁষে চলছে রিকশাভ্যান, মোটরসাইকেল ও ফলের ভ্যান। এর মধ্যেই একটি ভ্যানে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায় নীল রঙের কয়েকটি ড্রাম।

ভবনটির আশপাশের পরিস্থিতিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দোকান ও সাইনবোর্ডের ওপর দিয়ে জট পাকিয়ে ঝুলছে অসংখ্য তার; কোথাও রয়েছে তারের বড় কুণ্ডলী। ভবনের ওপরের তলাগুলোর দেয়ালে সারি সারি এসির আউটডোর ইউনিটও দেখা যায়। নিচতলায় রাসায়নিকের দোকান ও মজুদ, আর ওপরের তলায় হাসপাতাল—একই ভবনের এমন ব্যবহার বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে গতকাল মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম এ রুস্তম বণিক বার্তাকে জানান, ‘দেশের জনগণ, এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে সতর্কতা প্রয়োজন। সরকার কত পদক্ষেপ নেবে? বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এ নিয়ে নোটিসও দেয়া হয়েছে, কিন্তু এলাকার মানুষজন সরে না। এর আগেও পুরান ঢাকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু জনগণের নিজেদের সচেতনতা না থাকলে একা সরকারের পক্ষে পদক্ষেপ নেয়া অকার্যকর।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জরিপের তথ্য বলছে, পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৯২৪। এসব প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রশাসক আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাসায়নিকের দোকান ও গুদামগুলো অবৈধভাবে রয়েছে। কারণ ২০১৯ সাল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দেয়া বন্ধ।’

তবে লাইসেন্স না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে ব্যবসা বন্ধ হয়নি। ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে সরে যেতে আগ্রহী নন। বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন মিটফোর্ড এলাকার বুরহান পারফিউমারি অ্যান্ড রাসায়নিকসের ব্যবসায়ী সামাদ উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা এ এলাকায় ব্যবসা করছি। অনেক পরিচিত ব্যবসায়ীও এখানে রয়েছেন। হঠাৎ ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া আমাদের জন্য কঠিন। তবে সরকার বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করলে সেখানে যেতে আমরা প্রস্তুত।’

পুরান ঢাকার রাসায়নিকের ঝুঁকি সরাতে ২০১৯ সালে উদ্যোগ শুরু হলেও ছয়-সাত বছরেও স্থানান্তর প্রক্রিয়া গতি পায়নি। শ্যামপুরে ৬২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪টি অস্থায়ী রাসায়নিক গুদাম নির্মাণ করা হয়। যদিও রাসায়নিকের সিংহভাগ দোকান পুরান ঢাকাতেই রয়ে গেছে।

পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের নতুন করে আর লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (ঢাকা) মো. ছালেহ্ উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের নতুন কোনো লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না। আগের লাইসেন্সগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোও আর কার্যকর নেই। ২০১৯ সালের পর এসব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্যও ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই।’

তিনি জানান, ব্যবসাগুলো নির্ধারিত রাসায়নিক পল্লীতে স্থানান্তর করা হলে ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুযায়ী নতুন করে লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে রাসায়নিক মজুদের নিরাপত্তা, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার এবং আগুন লাগার পর প্রাথমিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

রাসায়নিকের ঝুঁকি নিয়ে আদালতের নির্দেশও রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে পুরান ঢাকার যেসব ভবনে রাসায়নিকের গুদাম, কারখানা ও দোকান রয়েছে, সেগুলোর তালিকা চেয়েছিলেন হাইকোর্ট। নিমতলী মামলায় একই বছর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর আদালতে ৮৬৭টি রাসায়নিক কারখানা ও গুদামের তালিকা দাখিল করে।

তবে চকবাজার মামলায় আদালতের আদেশের পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে বণিক বার্তাকে জানান বেলার লিগ্যাল কো-অর্ডিনেটর এস হাসানুল বান্না। তিনি বলেন, ‘নিমতলী ও চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা রয়েছে। চকবাজার মামলার আদালতের আদেশের পরও সংশ্লিষ্টরা তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি এবং আদালতে কমপ্লায়েন্সও জমা দেয়নি।’

পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের ঝুঁকি নতুন নয়। ২০১০ সালে নিমতলীতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকে রাসায়নিকের গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় অর্ধশতাধিক মানুষ। নয় বছর পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে রাসায়নিকের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের যানবাহনে। এতে ঘটনাস্থলে ৬৭ জনসহ মোট ৭১ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় কয়েকশ মানুষ। দুই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরও কাটেনি পুরান ঢাকার রাসায়নিকের ঝুঁকি।

আরও