ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাঁচলিয়ায় নির্মিত স্থাপনাটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও অব্যবহৃত পড়ে আছে। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশ্রামাগারটিতে ১০০টি পণ্যবাহী ট্রাক পার্কিং, চালকদের জন্য দ্বিতল বিশ্রামাগার ও ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। তবে চালু না হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন না চালকরা।
ট্রাকচালকরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ হলেও তাদের কোনো কাজে আসছে না। চালু না হওয়ায় মহাসড়কের পাশে অনেকটা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বিশ্রামাগারটি। আধুনিক বিশ্রামাগার কমপ্লেক্সটি এখন স্থানীয়দের গরু ছাগল রাখার স্থান ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দূরগামী পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের ক্লান্তি দূর ও দুর্ঘটনা রোধে ২০১৯ সালে দেশের চার মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। ২০২০ সালের ২১ মে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাঁচলিয়ায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জায়গায় বিশ্রামাগার নির্মাণকাজ শুরু হয়। একই বছরের ১৫ অক্টোবর তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। যার ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে আরো ১৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও মেসার্স সাগর বিল্ডার্স যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম নকশা অনুযায়ী বিশ্রামাগারটি দোতলা করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছিল। কিন্তু প্রকল্পের প্রায় শেষ সময়ে আরো দুই তলা বাড়িয়ে চারতলা করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বলা হয়, চারতলা ভবনের দুই তলা ব্যবহার করবেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও নিরাপত্তাকর্মীরা। আধুনিক এ বিশ্রামাগারে রয়েছে ১০০টি ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এছাড়া রয়েছে ক্যান্টিন, গোসলখানা, দ্বিতল শয়নকক্ষে চালক ও সহকারীর রাত্রীযাপনের ব্যবস্থা, বিনোদন পয়েন্ট, নামাজের স্থান, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা কক্ষ, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ, ওয়াশজোন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, সবুজায়ন ও সীমানার মধ্যে সীমিত আকারে খেলার ব্যবস্থা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সের নির্বাহী পরিচালক বাপ্পী সমাদ্দার জানান, কভিডের কারণে দুই দফায় কয়েক মাস প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। তবুও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকবার নকশা পরিবর্তন হওয়ায় সাব-স্টেশন ভবন নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল।
আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাগর বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিশ্রামাগারের মূল কাজ নির্দিষ্ট সময়েই শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পর কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলোও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে। তবে কেন বিশ্রামাগারটি চালু করা হচ্ছে না সেটা কর্তৃপক্ষের বিষয়।’
সওজ কর্তৃপক্ষ বলছে, বিশ্রামাগারে পণ্যবাহী ট্রাকচালক ও সহকারীরা নির্ধারিত সেবামূল্য পরিশোধ করে সেবা নিতে পারবেন। তবে দীর্ঘদিনেও চালু না হওয়ায় এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
রংপুর থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক সোলায়মান সেখ বলেন, ‘দীর্ঘ পথে চলাচলের সময় বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন পড়ে। রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে ঘুমাতে হয়। যেটা অনেকটা অনিরাপদ। অনেক সময় পণ্য চুরি ও ডাকাতের কবলে পড়তে হয়। বিশ্রামাগারে যদি বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে এমন ঝুঁকি আর থাকবে না। নিরাপদে গাড়ি চালানো যাবে।’
সিরাজগঞ্জ জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শরিফুল হায়দার রফিক সরকার বলেন, ‘পরিবহন চালকদের কর্মঘণ্টা একদমই মানা হয় না। তারা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর ফলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের বিশ্রাম ও নিরাপদে গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে সড়কের পাশে গাড়ি ও পণ্য রাখতে হয়। এর কারণে তাদের জীবনও অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। সেক্ষেত্রে বিশ্রামাগার নির্মাণ খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বিশ্রামাগারটি নির্মাণের পর দীর্ঘদিনেও চালু না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।’
সার্বিক বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে প্রকল্পটি প্রথম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে এর ইজারা বা কীভাবে বিশ্রামাগার পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের মধ্যে এখনো অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই বিশ্রামাগারটি চালু করা হবে।’