হুথি-সৌদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বহুমুখী সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ

অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশও খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকারী তালিকায় সৌদি আরামকোর পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক রয়েছে।

ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী সংকট তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মরত। দেশটি নতুন বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশেরও গন্তব্য। সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। এছাড়া জ্বালানি পণ্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও রিয়াদের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে। সৌদি-হুথি সংঘাতের ভৌগোলিক ক্ষেত্র সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় ঝুঁকি রয়েছে আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনেও। সেক্ষেত্রে আমদানি ও রফতানিতে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব অভিঘাত একসঙ্গে তীব্র হলে রেমিট্যান্স, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলতে পারে।

এরই মধ্যে যুদ্ধের চাপ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সংযোগে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক হুথি হামলার পর শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো সৌদি আরবগামী ফ্লাইট সীমিত করেছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়ে সৌদির বিনিয়োগ, নির্মাণ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি কমতে পারে। সে রকমটা হলে ধাক্কা লাগতে পারে দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশীর আয় ও কর্মসংস্থানে। সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ বাংলাদেশী কর্মসংস্থানের জন্য সৌদি আরবে গেছেন, যা ওই বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি বছর প্রথম আট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন। এছাড়া বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ৭০ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৯১৫ জন বা প্রায় ৪৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে রেমিট্যান্সের প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। বাসাভাড়া, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে তাদের সঞ্চয় কমে আসবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সে। একই সঙ্গে সৌদি অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সংকোচন দেখা দিলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীদের আয় ও কর্মসংস্থানেও চাপ তৈরি হতে পারে। প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যায় এবং তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের গন্তব্য সৌদি আরব। ফলে সৌদির শ্রমবাজারে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও বাংলাদেশের নতুন কর্মসংস্থান ও শ্রম রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

সাময়িকভাবে যুদ্ধের ইফেক্ট তো পড়বেই। শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখের ওপর বাংলাদেশী কাজ করেন। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা হচ্ছে, আশা করছি ইন দ্য লং রানে এ সমস্যা আমরা উতরে যাব। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হলে তা শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, অন্যান্য দেশেও এর প্রভাব পড়বে। তবে এ মুহূর্তে দেশে সে ধরনের অসুবিধা দেখা যাচ্ছে না—শামা ওবায়েদ ইসলাম ,পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি খাতের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকবে বলে বিভিন্ন পূর্বাভাসে উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরো বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি জ্বালানির আমদানি সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তখন বেশি দাম দিলেও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাবে কিনা সে নিশ্চয়তা থাকে না। সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, শ্রমবাজার, জ্বালানি সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। এর বাইরে আবুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ। এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়।

অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশও খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকারী তালিকায় সৌদি আরামকোর পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক রয়েছে। ফলে সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়ে উৎপাদন, রফতানি টার্মিনাল, বন্দর বা আঞ্চলিক নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সময়মতো ক্রুড অয়েল পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাত আঞ্চলিক শিপিং রুট, বীমা ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জে চাপ তৈরি করলে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাশরুর রিয়াজ গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের বাজার অনেকটাই সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে ক্রুড অয়েলের সরবরাহ ও দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ এমনিতেই জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এলএনজির সরবরাহ ও উচ্চমূল্যের চাপের সঙ্গে যদি জ্বালানি তেলের সংকট বা আমদানি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে তা দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট, আমদানি সক্ষমতা ও সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

ঝুঁকি শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। উন্নত দেশগুলোয় ভোগব্যয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে বাংলাদেশের রফতানি হ্রাসের ঝুঁকিও থাকবে।’ তার মতে, সম্ভাব্য ক্ষতির ক্ষেত্রগুলো এখন থেকেই চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করে সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরি। আর দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার এবং জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে।

সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে সারও রয়েছে। দেশটি থেকে ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং ডিএপি আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বিএডিসি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১১টি লটে ডিএপি আসার কথা রয়েছে। পাঁচটি লট (২ লাখ টন) এরই মধ্যে দেশে এসেছে। বাকি চালানগুলো আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ আনার প্রক্রিয়া চলছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হবে কিনা, আমরা জানি না। তবে সরবরাহকারীরা এখন পর্যন্ত ডিএপি সরবরাহ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তার কথা জানায়নি, আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সংকট বিস্তৃত হলে হয়তো আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হতে পারে।’

অন্যদিকে বিসিআইসির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় মোট ৫ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টন নিশ্চিতভাবে কেনার কথা এবং বাকি দুই লাখ টন ঐচ্ছিক চুক্তির আওতায়। ১৬ ও ২২ অক্টোবর একটি করে মোট দুটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া নিয়ে দেশে পৌঁছার কথা রয়েছে। নভেম্বরের জন্য আরো দুটি জাহাজের লোডিং প্রক্রিয়া চলছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সরবরাহকারী সৌদি প্রতিষ্ঠান স্যাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস এ পর্যন্ত দুবার বন্দর পরিবর্তন করেছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ সচল থাকলেও আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে বিকল্প রুট ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা টেকসই থাকবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউরিয়া আমদানি নিয়ে এখন পর্যন্ত ঝুঁকি দেখছি না। ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলা যাচ্ছে না।’

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্পর্ক এখনো তুলনামূলক সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল শেষে বাংলাদেশে সৌদি আরবের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই স্টক) পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার ডলার, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে যা ৩ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে আসে। তবে সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আকর্ষণে সম্প্রতি তৎপরতা বাড়িয়েছে সরকার। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করা সৌদি আরবের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বন্দরসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহের কথা জানায়। আগস্টে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে ওই সফরের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অস্থির থাকলে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসএবিসিসিআই) সভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হতে পারে। সেখান থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়। আবার সেখান থেকে জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সার আমদানি করে বাংলাদেশ। ফলে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য ও আমদানি—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

সৌদিতে চলমান সংঘাতে বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সামনে এসেছে। ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি হামলায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশী। এছাড়া আহত হন আরো ২৪ বাংলাদেশী। সংঘাত বিস্তৃত হলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়বে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘যেভাবে হুথি-সৌদি সংঘাত বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। এ ধরনের পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এরই মধ্যে বাংলাদেশী কর্মীদের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অভিবাসনের প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।’

সরকারকে শুধু তাৎক্ষণিক বা ছোটখাটো পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশের কৌশল নিতে হবে। এজন্য দেশের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হলেও দেশের অভিবাসন খাত এতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে না।’

সাময়িকভাবে যুদ্ধের কিছু প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল রাজধানীতে ‘ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: নেভিগেটিং পাথওয়েজ ইন আ শিফটিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখের ওপর বাংলাদেশী কাজ করেন, তো সেই জায়গায় একটা ইফেক্ট তো পড়বেই। কিন্তু আমরা আশা করব, নতুন নতুন বাজার যেহেতু খোঁজা হচ্ছে, ইন দ্য লং রান এ আমরা সমস্যা উতরে যাব।’

তিনি জানান, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে কিছু বাংলাদেশী চাকরি হারিয়েছেন, কেউ কেউ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন এবং অনেকে কর্মসংস্থান ছাড়াই সেখানে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতি প্রবাসী আয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।

শামা ওবায়েদ আরো বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার তথ্য আমাদের কাছে নেই। জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকার কাজ করছে। নতুন উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।’

আরও